1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় বিকাল ৫:৪২ আজ রবিবার, ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি




শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল করিমের জন্মস্থানে অনেক স্মৃতিই উপেক্ষিত; আক্ষেপ শহীদ জননীর

  • সংবাদ সময় : শনিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২১
  • ১৭৭ বার দেখা হয়েছে

এবিএস লিটন, মহিমাগঞ্জ:
১৪ নভেম্বর (রবিবার)। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আজকের এ দিনে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে প্রাণপন যুদ্ধ করে যুদ্ধক্ষেত্রেই শহীদ হন মহিমাগঞ্জের অসীম সাহসী মুক্তিসেনা ফজলুল করিম। যুদ্ধপরবর্তী নতুন বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ফজলুল করিমের বীরত্ব আর আত্মদানের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে ওই ইউনিয়নের নামকরণ করা হয় ফজলুপুর। তবে মহান এ যোদ্ধার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা নিজ এলাকা মহিমাগঞ্জেই এখন অনেকটা অচেনা তিনি। মহিমাগঞ্জ বাজারে তাঁর নামে একটি রাস্তার নামকরণ করা হলেও শহীদের বাড়িতে যাওয়ার একটি সরাসরি রাস্তা তৈরি হয়নি আজ পর্যন্ত। তাঁর পরিবার রাষ্ট্রীয় সম্মানীভাতা পেলেও ঘর-বাড়ি-চাকুরীসহ অনেক মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।
১১ নম্বর সেক্টরের রনজু কোম্পানীর ৩ নম্বর প্লাটুনের প্লাটুনকমান্ডার মহিমাগঞ্জের মকবুল হোসেন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলাম টুকু ও মোজাম্মেল হকের কাছ থেকে শোনা গেলো সেদিনের সেই বীরত্ব আর শোকের কাহিনী। তাঁরা জানান, ১৪ নভেম্বর’১৯৭১-এর ভোরবেলা। মহান মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়। তৎকালীন গাইবান্ধা মহুকুমার ফুলছড়ি থানার অন্তর্গত দুর্গম চরাঞ্চল কালাসোনারচরের একটি ছোট বাঁধরাস্তা। সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় দু’পাশের মাঠের আধাপাকা সোনালী ধানের শীষগুলো তাদের শিশিরভেজা নুয়ে পড়া মাথা নিয়ে। ভোরবেলার এ সময়ে যুদ্ধের ডিউটি বদলের লক্ষ্যে ওই এলাকার রসুলপুর ব্রীজের পাহারার দায়িত্বরত রাজাকার ও পাকসেনার দল কেতকিরহাট ক্যাম্পে এবং ওই ক্যাম্পের দায়িত্বরতরা রসুলপুর ব্রীজে যাচ্ছিলো। তাদের অনুসরণ করে শীতের তীব্রতা আর কুয়াশাচ্ছন্ন আধো অন্ধকার শিশিরভেজা পথ পেরিয়ে দেশমাতৃকার মুক্তির নেশায় পাগল ১০-১২ জনের একদল যুবক ধানক্ষেতের আইলপথ ধরে নিজেদের আড়াল করে এগিয়ে চলেছেন। কেতকিরহাট-রসুলপর ব্রীজ এর মধ্যবর্তী স্থানে উঁচু বাঁধের ওপর পাকিস্তানী সৈন্যদের দু’গ্রুপ একত্র হতেই নিচের ধানক্ষেতের আইলের আড়াল থেকে মাত্র আটজন মুক্তিসেনা ৮টি মেশিনগান দিয়ে গুলি শুরু করেন তাদের ওপর। অতর্কিত হামলায় এ সময় ১১ পাকিস্তানী সৈন্য নিহত এবং রাজাকারসহ ২০-২৫ জন আহত হয়। বেলা ১১টার দিকে গাইবান্ধা থেকে অতিরিক্ত সৈন্য এসে স্বল্প সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার এ দলকে ঘিরে ফেলে একসময় । “মারবো না হয় মরবো” এ প্রতিজ্ঞা বুকে নিয়ে বাঁধের মত বড় একটি আইলকে প্রতিরক্ষাব্যুহ হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের সীমিত অস্ত্র আর মনের অদম্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রাণপন লড়াই চালিয়ে যান তারা। শুধু নিজেদের রক্ষা নয়-শত্রুনিধনে বেপরোয়া হয়ে ওঠে ১১ নম্বর সেক্টরের রনজু কোম্পানীর ৩ নম্বর প্লাটুনের ১০-১২ জনের এ মুক্তিযোদ্ধার দলটি। খবর পেয়ে পাশর্^বর্তী খাটিয়ামারির চরের একদল মুক্তিযোদ্ধা তাদের সাথে যোগ দিয়ে প্রায় সারা দিনভর চালান এ যুদ্ধ। স্বাধীনতার লক্ষ্যে অনড় সামান্য কয়েকজন স্বল্পপ্রশিক্ষিত যুবকের অদম্য মনোবলের কাছে পরাজিত হয় সমরবিদ্যায় সুশিক্ষিত পাকবাহিনীর একটি বড় দল। বিকেলে অর্ধশতাধিক হতাহতের দেহ উদ্ধার করে এবং ১১জন পাক সেনার মৃতদেহ ফেলেই গাইবান্ধায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় তারা। পালানোর আগে ১১ পাকসেনার হত্যাকারী হিসেবে গুলিবিদ্ধ ফজলুল করিমকে ধানক্ষেতের মধ্যে ঘিরে ফেলে ব্রাশফায়ারে বুক ঝাঁঝরা করার পরও বেয়নেট চার্জ করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা। পরে শত্রুসেনাদের গুলিতে আহত আর ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর মুক্তিযোদ্ধার দলটিকে রক্ষায় এগিয়ে আসে আশপাশের গ্রামের কিছু মানুষ। সূর্য্য ডোবার আগেই ধান ক্ষেতের মধ্যে বিক্ষিপ্ত ভাবে পড়ে থাকা আহত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে উদ্ধার করেন তারা। সহযোদ্ধা এবং গ্রামবাসীরা খুঁজে পান সেদিনের যুদ্ধের শহীদ হওয়া মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় সেনানী একই মহুকুমার গোবিন্দগঞ্জ থানার মহিমাগঞ্জের কলেজছাত্র ফজলুল করিমের মৃতদেহ। এর মধ্যে গুরুতর আহত মহিমাগঞ্জের তাজুল ইসলাম টুকুকে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় ভারতের মাইনকারচর ক্যাম্পের হাসপাতালে। আর সম্পুর্ণ আত্মীয়-পরিজনবিহীন অবস্থায় অনাত্মীয় গ্রামবাসী আর সহযোদ্ধাদের হাতে রাতের আঁধারেই কালাসোনারচরের মাটিতে সমাহিত হন শহীদ ফজলুল করিম।
এক মাস পরে গাইবান্ধা জেলা শত্রুমুক্ত হবার পর ১৩ ডিসেম্বর শহীদের সহযোদ্ধা, ওই প্লাটুনের প্লাটুন কমান্ডার মহিমাগঞ্জের মকবুল হোসেনের কাছ থেকে শহীদ ফজলুল করিমের মৃত্যুর খবর পান তার স্বজনরা। কালাসোনারচরের ১৪ নভেম্বরের যুদ্ধ এবং এ যুদ্ধের অকুতোভয় বীরসেনানী শহীদ ফজলুল করিমের বীরত্ব আর আত্মদানের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে সেখানকার মানুষ ওই এলাকার নাম রাখেন ফজলুপুর। স্বাধীনতার পরপরই তৎকালীন এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের একাংশের নাম বদলে রাখা হয় “ফজলুপুর ইউনিয়ন”। বর্তমানে এটি ফুলছড়ি উপজেলার ৭ নং ইউনিয়ন। মহিমাগঞ্জ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি মশিউর রহমান বাবলুর উদ্যোগে ১৯৭৮ সালের ১৪ নভেম্বর শহীদ ফজলুল করিমের নিজ এলাকা মহিমাগঞ্জে তার স্মৃতিতে একটি সড়কের নামকরণ করে মহিমাগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। বর্তমানে কোন নামফলকও নেই এখানে। কিছু দোকানের সাইনবোর্ডেই কেবল এ নামের অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ।
শহীদের বাড়ির সামনের শিংজানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সরাসরি কোন রাস্তা না থাকায় অনেকটা পথ ঘুরে শুক্রবার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের পুনতাইড় শিংজানি গ্রামে গিয়ে দেখা পাওয়া যায় শহীদ ফজলুল করিমের ভগ্ন বাড়িটি ও স্বজনদের। পুত্র হারানোর ব্যথা বুকে নিয়েই ২০১৬ সালে পিতা দেলোয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করেন বলে জানান শহীদের স্বজনরা। সারাটি জীবন ধরেই সন্তানের জন্য কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে যাওয়া শহীদমাতা ৯৩ বছর বয়সী আছিয়া বেগম জানালেন, এখন নিয়মিত সরকারী রেশন ও রাষ্ট্রীয় সম্মানীভাতা পাওয়ায় তাদের দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা স্বচ্ছলতা আসলেও তাঁর সন্তান বা নাতি-নাতনী কেউ সরকারি চাকুরী না পাওয়ায় গভীর মনঃকষ্টে ভুগছেন তিনি। অনেক মুক্তিযোদ্ধার নামে সরকারি বাড়ি বরাদ্দ হলেও তাদের এখনও থাকতে হয় একটি ভাঙা বাড়িতে। তবে সরকারি উদ্যোগে বাড়ি সংলগ্ন কবরস্থানে শহীদ সন্তানের জন্য একটি পাকা কবর নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী বর্তমান সরকারের প্রতি।
ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে বড় ভাইয়ের কবর বিলীন হলেও শহীদ ফজলুল করিমের নামে সেখানে একটি ইউনিয়নের নাম হওয়ায় মানসিক শান্তি যেমন মিলেছে, তেমনি জাতীয়ভাবে এমনকি নিজ এলাকাতেও শহীদ ফজলুল করিমকে স্মরণ না করায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তার ছোট ভাই মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের পুনতাইড় শিংজানী গ্রামের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, শহীদ এ পরিবার বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দূরে থাক, তাদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য মাত্র চারশ’ মিটার দীর্ঘ একটি রাস্তার অভাবে অনেকটা পথ ঘুরে অথবা অন্যের জমির আলপথ ধরে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। সারা বছর না হোক প্রতিবছর ১৪ নভেম্বর তাঁর শহীদ সন্তানের মৃত্যুর দিনটিকে সবাই স্মরণ করুন এমন আকুতি নিয়েই দিনাতিপাত করছেন শহীদ ফজলুল করিমের নবতিপর বৃদ্ধা মাতা আছিরন বেগম।
মহিমাগঞ্জের এ মহান শহীদের স্মরণে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবী করেছেন এলাকার বিভিন্ন সংগঠন ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন।




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ