1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় সন্ধ্যা ৭:০১ আজ সোমবার, ১২ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে সফর, ১৪৪৩ হিজরি




এক জনমের সুখ-দুঃখের ইতিকথা

  • সংবাদ সময় : শনিবার, ২৬ জুন, ২০২১
  • ১০৩ বার দেখা হয়েছে

মাজহারউল মান্নান:

পর্ব-১১: আমি মডার্ন হাইস্কুলে ভর্তি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে স্কুলের নানা অনুষ্ঠনে গান গেয়ে, কবিতা আবৃত্তি করে, বাঁশি বাজিয়ে এমন কি হাম্দ-না’ত গেয়ে সবার দৃষ্টি কাড়তে লাগলাম। একদিন সুরেলা কণ্ঠে জোহরের নামাজের আযান দেওয়া দেখে মওলানা গফুর স্যার বলে বসলেন, এখন থেকে তুঁই নিয়মিত আযান দিবি। এভাবে সবার কাছে বেশ পরিচিত হয়ে গেলাম। আমাকে নিয়ে স্কুলের সব ছেলেমেয়ের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল। এ যেন এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।
ঊনিশশ’ ঊনষাট সালের কথা। জুন মাসে ষাণ¥াসিক পরীক্ষা। ক্লাসের পড়া যতটুকু পড়েছি তার চেয়ে লাইব্রেরি থেকে নেয়া অন্য বই পড়েছি অধিক। এমনকি পরীক্ষার প্রোগ্রাম পাওয়ার পরও গোগ্রাসে গিলেছি রবীন্দ্রনাথের ‘নৌকাডুবি’, শরৎচন্দ্রের ‘দত্তা’ আর তারাশঙ্করের ‘আরোগ্য নিকেতন’।
এরই মধ্যে মনোতোষের কাছে একদিন দেখি মনোরম প্রচ্ছদের দুটো বই। প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর ‘চিরবান্ধবী’ আর অবধূতের ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’।
আমার দৃষ্টি তো আর ফেরে না। ভাবলাম, চাই। মনোতোষ যে টাইপের ছেলে, না বলবে না। কিন্তু পরীক্ষার ভয়ে লোভ সংবরণ করলাম।
পরীক্ষা দিলাম। একেবারে খারাপ না। তবে আশানুরূপ হলো না।
রেজাল্টের দিন কিছু কানাঘুষা শুনলাম। সেকেন্ড বয় শাজাহানকে নিয়ে একটা সমস্যা হচ্ছে। কী সমস্যা?
নোটিশবোর্ডে রেজাল্ট টানাতেই শুনলাম মনোতোষই ফার্স্ট হয়েছে। কিন্তু শাজাহান তার পজিশন হারিয়ে হয়েছে থার্ড। ভিড়ের মধ্যে থেকে কবীর আনন্দের সাথে চিৎকার করে বললো, মামু, তুই সেকেন্ড হয়েছিস বাহে। আমি এখানে এসেই সেকেন্ড হয়েছি। কবীরের আনন্দ আর ধরে না।
আমার কিন্তু তেমন আনন্দ হলো না। উল্টা শাজাহানের জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেল। কারণ এই সরলসোজা লম্বা ছেলেটা এর মধ্যেই আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। ওকে কী বলে সান্ত¡না দেবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমাকে বিস্ময়ে অভিভূত করে দিয়ে সে আমার কাছে এসে বললো, কি রে গাধা, শেষ পর্যন্ত সেকেন্ড হলি। আমি তো ভাবছিলাম তুই মনোতোষকে ডজ দিয়ে হবি ফার্স্ট। তা না, হলি সেকেন্ড।
ওর কথা শুনে মনে হলো ও থার্ড না হয়ে যদি লাস্টও হতো তবুও ওকে কোনো হতাশা কিংবা মালিন্য স্পর্শ করতো না।
অল্পদিন পরই আবার প্রি-টেস্ট। এবার সবকিছু ছেড়ে মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করলাম। পরীক্ষা ভালই দিলাম। কিন্তু রেজাল্ট তেমন একটা হেরফের হলো না। গণিত আর ইংরেজিতে নম্বর কিছু বাড়লো। কিন্তু পজিশন থাকলো পূর্বের মতোই। অবশ্য এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার মতো মানসিক অবস্থাও আমার ছিল না। কী করে ম্যাট্রিক পরীক্ষা পর্যন্ত পার হবো সেটাই ছিল আমার দিবারাত্রির ভাবনা।
অনেক ঘটন-অঘটনের মধ্য দিয়ে বছর শেষ হয়ে গেল। পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো টেস্ট। নানা অভাব অনটনের কারণে পড়ালেখা ঠিক মতো হলো না। বুঝলাম, এবার ধরা খাবো। মনোতোষ সাহা এমনিতে খুব সুশৃঙ্খল আর মনোযোগী ছাত্র। এছাড়াও সে বিভিন্ন বিষয়ে প্রাইভেটও পড়ে। বিশেষ করে হাবিবুর রহমান স্যারের কাছে শেখে অংক। শাজাহানও সচেতন হয়েছে বেশ। এদের কাছে তখন আমি তুচ্ছই।
খুব সকালে সামান্য পান্তা অথবা বাসি ভাত খেয়ে হেঁটে রওনা হই পাঁচ মাইল পথ। পকেটে কোনোদিন পাঁচটা পাইও থাকে না যে সামান্য কিছু কিনে খাবো। সেই সকাল থেকে সারাদিন অভুক্ত থেকে স্কুল শেষে যখন বাড়ির পথ ধরতাম তখন ক্ষুধায় পেটের ভেতর চিনচিন করে ব্যথা করতো। পা কিছুতেই চলতে চাইতো না।
এর মধ্যেই একদিন টেস্ট শুরু হলো। মা চেষ্টা করে খুব সকালে চারটা ভাত রেঁধে দেন। অনেকটা পথ। সকাল সকালই রওনা হই। কবীরও আমার সাথে যায় আর উৎসাহ যোগায়। রাস্তায় আমাকে নানা প্রশ্নের উত্তর স্মরণ করিয়ে দেয়। আমি পরীক্ষার হল থেকে বেরোলেই ও ছোঁ মেরে প্রশ্নটা আমার হাত থেকে নিয়ে বলে, মামু, এগুলো তো তোর কাছে পানিপন্তা বাহে।
ওর উৎসাহের অন্ত নেই। কিন্তু আমি তো জানি, আমার পরীক্ষা খুব একটা ভালো হচ্ছে না। বিশেষ করে বাংলায় খুব খারাপ করলাম। অনেক অতৃপ্তির মধ্য দিয়ে টেস্ট শেষ হলো।
ক’দিন পরই রেজাল্ট। জানি এবার আর সেই সুনাম রক্ষা হবে না। শুরুতে যেভাবে সবাইকে চমকে দিয়েছিলাম, তার করুণ পরিসমাপ্তি ঘটবে এবার।
রেজাল্টের দিন দুপুরের পর গেলাম স্কুলে। অন্যান্য ক্লাস ছুটি হয়েছে আগেই। স্যাররা রেজাল্ট তৈরিতে ব্যস্ত। বাইরে পরীক্ষার্থী আর তাদের আত্মীয় স্বজন ভিড় করছে। বেলা ডোবার একটু আগে রেজাল্ট নোটিশ বোর্ডে টানিয়ে দেয়া হলো।
সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লো নোটিশ বোর্ডে। আমি খানিকটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভিড়ের ভেতর যাবার মত সাহস শক্তি কোনটাই আমার ছিল না।
রেজাল্ট দেখে অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়লো। শুনলাম, ওদের নাম নেই। ডিজঅ্যালাউড হয়েছে দ্বিতীয় বারের মতো। অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে এবারে পাশ করেছে বলে। আমার নাম কেউ নিচ্ছে না।
সেদিন কবীরও নেই। আমি আতঙ্কিত হতে লাগলাম।
কে যেন বললো, শাজাহান এবারও থার্ড হয়েছে। তাতেই হৈ চৈ করে সন্তোষ প্রকাশ করছে শাজাহান।
এমন সময় ফার্স্ট বয় মনোতোষ, শান্তশিষ্ট মনোতোষ চন্দ্র সাহা, যে কিনা এ পর্যন্ত কোনো পরীক্ষায় কোনোদিন সেকেন্ড হয়নি, সে আমার একেবারে কাছে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো, অ্যাট লাস্ট ইউ ক্যারিড দ্য ডে। তুই ফার্স্ট হয়েছিস। কংগ্রাচুলেশন।
প্রতিদ্বন্দ্বীর বুকের উষ্ণতা আমাকে হতবিহ্বল করে তুললো। আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। আমার বুকের নদীতে তখন কান্নার ঢেউ ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো।
বলতে চাইলাম, মনোতোষ, আসলে তুই আমাকে হারিয়ে দিলি ভাই। তোর সাথে আমার তুলনা হয় না। কিন্তু মুখ ফুটে কথাটা বলা হলো না।

 




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ