1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় বিকাল ৫:৩১ আজ শুক্রবার, ৩১শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৪ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি




এক জনমের সুখ-দুঃখের ইতিকথা :পর্ব – ০৩

  • সংবাদ সময় : মঙ্গলবার, ৪ মে, ২০২১
  • ৬২ বার দেখা হয়েছে

মাজহারউল মান্নান:

(পূর্ব প্রকাশের পর)
ক্লাস সেভেনে বার্ষিক পরীক্ষা দেয়ার আগেই আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল। সারা বছরের বেতন বাকি। পরীক্ষার ফিস দেয়া হয়নি। আগের বছরের পাওনাই অনেক বাকি।
হেড স্যার একদিন আমাকে ক্লাস থেকে বের করে দিলেন।
সারাদিন বেওয়ারিশ প্রাণীর মতো পথেঘাটে ঘুরি। বিকেলে বাড়ি ফিরি শুকনো মুখে। মার মুখের দিকে তাকানো যায় না। স্বপ্নভঙের নিদারুণ হতাশা তার চোখেমুখে।
এমন সময় একটা আকস্মিক ঘটনা ঘটলো। চৌধুরানী থেকে এক ডাক্তার ভদ্রলোক টিনের ঘর কেনার জন্য এলেন আমাদের পাশের বাড়ির মফিজ চাচার কাছে। এলাকার হিন্দুরা সস্তায় বাড়িঘর বেচে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে। মফিজ চাচা এসব বেচাকেনার দালাল।
ডাক্তার সাহেব টিন কেনার জন্য এক সপ্তাহ চাচাদের বাড়ি থাকলেন। এর মধ্যে তার সাথে বেশ জানপরিচয় হলো আমার।
যাবার দিন তিনি আমাকে কাছে ডেকে বললেন, তোমার পড়াশোনার প্রতি তো বেশ ঝোঁক। চল আমার সাথে। তোমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেবো।
কথাটা মা’র কাছে পাড়তেই তিনি আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। ডাক্তার সাহেবের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
যাবার সময় হয়ে এলো। সামান্য কাপড়চোপড় আর দুটো আধুলি আমাকে দিয়ে মা আঁচলে চোখ চেপে ধরে থাকলেন। ছোট ভাইবোন তিনটা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো।
বা’জান মাঠ থেকে ফেরেননি। তার জন্য আর দেরি করা গেল না।
ভদ্রলোকের ব্যাগটা হাতে নিয়ে তার পিছু পিছু ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের বড় রাস্তায় এসে যখন উঠলাম, পিছন ফিরে দেখি, তখনও ওরা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে পথের দিকে তাকিয়ে আছে।
একবার ভাবলাম, ওদের ছেড়ে যাবার দরকার নেই। কী হবে লেখাপড়া করে। কিন্তু ততক্ষণে আমি অনেকটা পথ চলে এসেছি।
গাইবান্ধা রেল স্টেশনে যখন ট্রেনে উঠলাম তখন পুরোপুরি সন্ধ্যা। হুস হুস করে ট্রেন ছুটছে উত্তরের দিকে আর আমার মন পড়ে থাকছে পেছনে। চোখের সামনে অতি চেনা প্রকৃতি আর স্বজনদের মুখ ভেসে উঠে মুহূর্তেই মিলিয়ে যাচ্ছে। ট্রেনের শব্দের তালে তালে মনে হচ্ছে, সবাই যেন বলছে, কোথা যাস্ … কোথা যাস্ … কোথা যাস্?
প্রচ- শব্দে ট্রেনটা একটা ব্রিজের উপর উঠতেই আমার সম্বিত ফিরে এলো।
চৌধুরানী রেল স্টেশন থেকে পশ্চিম দিকে টানা দেড় ক্রোশ পথ পায়ে হেঁটে যেখানে পৌঁছলাম তার নাম ম-লের ঘাট। ছোট্ট একটা নদী। নদীর উপরে বাঁশের সাঁকো। অন্ধকারে অতি কষ্টে সাঁকো পার হয়ে ডাক্তার সাহেবের বিরাট টিনের বাড়িতে যখন পৌঁছলাম তখন রাত প্রায় বারোটা।
ক’দিন পর ডাক্তার সাহেব আমাকে চৌধুরানী আপগ্রেডেড হাই স্কুলে ক্লাস এইটে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু নিজের বাড়িতে রাখলেন না। লজিং করে দিলেন নদীর উত্তর পারের সরকারদের বাড়ি।

কাফি সরকার আমার লজিং মাস্টার। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। দুই সংসার। প্রথম পক্ষের সন্তানাদি না হওয়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় পক্ষের দুই ছেলে রফিক আর শফিককে আমি পড়াই। বড় ছেলে রফিক প্রায় আমার সমবয়েসী।
আমি যে ঘরটায় থাকি সেটা কাছারি ঘর। তার এক পাশে থাকে দুটো গাড়ির বলদ আর এক পাশে আমি আর একটা কাজের ছেলে। মশারি নেই। রাতে মশার জ্বালা আর গরুর ছটফটানিতে ঘুম আসে না।
বাড়ির কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে বা’জানের বিষণœ চেহারা। মায়ের ক্লান্ত মুখ। সবচেয়ে বেশি করে মনে পড়ে উপোস থাকা ভাইবোনদের কথা।
আমার খাবার আসে কাছারি ঘরেই। কাজের ছেলেটা নিজে খেয়ে তারপর নিয়ে আসে আমার জন্য। কোনোদিন সে না থাকলে ভেতর বাড়িতে ডাক পড়ে। আমি মাথা নিচু করে বাড়ির ভেতরে যাই। মাথা নিচু করে খাই। মাথা নিচু করেই চলে আসি।
এ নিয়ে বাড়ির মেয়েরা হাসাহাসি করে। আমি বুঝতে পারি। কিন্তু লজ্জায় মাথা তুলে কারও দিকে তাকাতে পারি না।
সকালে ছেলে দুটোকে পড়িয়ে দেড় ক্রোশ দূরের স্কুলে যাই। বিকেলে ফিরি ক্লান্ত হয়ে। সন্ধ্যা না লাগতেই আবার ছেলে দুটোকে পড়াতে বসি।
এমনি করে দিন যায়। কিন্তু আমার পড়াশোনা তেমন এগোয় না।
এগোয় না, কারণ সেই পুরোনো সমস্যা। বইখাতার ঠিক নেই। মাসের পর মাস বেতন বাকি। এক প্রস্থ মাত্র কাপড়। ধুুয়ে দিলেই সেদিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ। তার উপর ছেলে দুটো পড়ানোর সময় বই খুলে বসলেই লজিং মাস্টার বিরক্ত হন।
বলেন, তুমিই যদি সব সময় পড়ো, তবে আমার ছেলেদের পড়াবে কী?
ওদের পড়া শেষ করতেই বেশ রাত হয়ে যায়। তখন আর বই খুলতে ইচ্ছে করে না।
বাইরে আঁধার ঘনীভূত হয়। জঙ্গলের ধারে জোনাকিদের আনাগোনা বাড়ে। কাছে কোথাও শিয়াল ডেকে ওঠে। দূর গাঁয়ে কুকুরের চিৎকার কান্নার মতো শোনায়। বুক দুরু দুরু করে। কোনো কোনো দিন ভয়ে গায়ে মাথায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ি। কিন্তু ভয় কাটে না।
এমন সময় বদনার নলে কাঁসার গেলাসের ঠুন ঠুন শব্দে ধড়ে পানি আসে। বোঝা যায়, সবার খাওয়া শেষ কাজের ছেলেটা আমার জন্য খাবার নিয়ে আসছে।
ততক্ষণে ক্ষুধা মরে যায়। খেতে ইচ্ছে হয় না। কোনো রকমে দুটো মুখে দিয়ে শুয়ে পড়ি।
স্বপ্নে মাকে দেখি। নদীর ওপার থেকে হাতছানি দিয়ে মা ডাকে।
বলে, বা’জানরে, তোর কি খুব কষ্ট? ফিরে আয় বাপ। মায়ের বুকে ফিরে আয়।
জেগে উঠে দেখি চোখের পানিতে বালিশ ভিজে গেছে। (চলবে …)

 




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ