1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় বিকাল ৪:৫১ আজ শুক্রবার, ৩১শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৪ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি




এক জনমের সুখ-দুঃখের ইতিকথা-পর্ব ০২

  • সংবাদ সময় : মঙ্গলবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২১
  • ৮৯ বার দেখা হয়েছে

মাজহারউল মান্নান:
উনিশশ’ পঞ্চাশের দিকের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে অনেক আগে। ভারত-ভাগের উত্তাপও কমে এসেছে। কিন্তু দুর্ভিক্ষ ক্রমেই গ্রাস করছে গ্রামগঞ্জ।
কন্ট্রোলের বাজার। কেরোসিন আক্রা। মা বেলা ডোবার আগেই রান্নাবান্না শেষ করে সবাইকে খাইয়ে দেন। সন্ধ্যায় কেরোসিনের কুপিটা জ্বালিয়ে দেন আমার সামনে।
মেঝেতে বসে আমি ইতিহাসের দিগি¦জয়ী সম্্রাট আলেকজান্ডার আর বন্দী রাজা পুুরুর বীরোচিত কাহিনী মুখস্থ করি। মা কখনও আমার মুখের দিকে, কখনও স্বচ্ছ কুপিটার নিঃশেষ প্রায় তেলের দিকে তাকান। সলতেটা বারবার উস্কে দিয়ে বইয়ের কালো কালো অক্ষরগুলোর উপর থেকে অন্ধকার সরিয়ে দেয়ার বৃথা চেষ্টা করেন।
তেল ফুরিয়ে আসে। বাতি নিভে যায়। অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেন।
এক সন্ধ্যায় কোনোক্রমে কুপি জ্বালাবার তেলের সংস্থান হলো না। মা এর ওর বাড়িতে গেলেন একটুখানি তেল কর্জ করতে। ফিরে এলেন খালি হাতে। কে কর্জ দেয়। সবারই তো একই অবস্থা।
কী মনে করে মা আবার গেলেন আমাদের ঠিক পিছনের বাড়িতে।
বাড়িটা ফজর আলী নানার। আপন কেউ নয়। গ্রাম সম্পর্কে নানা বলে ডাকি। তার বউকে ডাকি কান্দ্রী নানী।
তাদেরও সংসার খুব সচ্ছল নয়। খেয়ে না খেয়ে সামান্য পয়সাপাতি জমিয়েছেন। তা আগলিয়েও রেখেছেন যক্ষের ধনের মতো। কেরোসিন কেনা লাগবে বলে বিকেলেই খাওয়া দাওয়া সারেন। খরচাপাতির ভয়ে নিজের তিন চারটা ছেলেমেয়েকে স্কুলমুখো করেননি কোনোদিন।
কান্দ্রী নানীদের বাড়ি থেকেও মা ফিরে এলেন খালি হাতে।
আমি বইপুস্তক গুছিয়ে রেখে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। মা হতাশ হয়ে আঙিনায় অন্ধকারের মুখোমুখি বসে থাকলেন।
এমন সময় ছোট্ট একটা শিশিতে সামান্য একটু কেরোসিন নিয়ে কান্দ্রী নানী নিজেই এলেন আমাদের বাড়ি।
বললেন, বউ, এই ত্যাল কোনা ঠ্যাকা-ব্যাঠ্যাকার জন্যে থুছনুম। সেই জন্যে তোমাক না কছনুম। পরে মনে হলো, হায়রে, অ্যাকনা ত্যাল ব্যাগরে ছ’লটা পড়বার পায় না। এ ত্যাল ঘরোত থুইয়া কী হ’বে। ন্যাও, অর ন্যাম্পোটা জ্বলে দ্যাও, পড়–ক।
মা বিস্মিত হলেন। কিছু বললেন না। তেলটুকু তুলে কুপিটা আমার সামনে জ্বালিয়ে দিলেন। কুপির সেই স্বল্প আলোতে আমি বই খুলে পড়তে বসলাম। জনম দুখিনী, হতদরিদ্র, দুই নিরক্ষর নারী কান্দ্রী নানী আর আমার মা চোখের পানিতে বুক ভিজিয়ে আমার পড়া দেখতে লাগলেন।
ক্লাস সিক্সে উঠে আমার বই পড়ার নেশা গেল সাংঘাতিক রকম বেড়ে। অল্প দিনের মধ্যেই আমি ‘রামের সুমতি’, ‘মেজদিদি’, ‘গল্পবীথি’, ‘গল্পগুচ্ছ’, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘নক্শী কাঁথার মাঠ’, ‘টম কাকার কুটীর’, ‘রবিনসন ক্রুশো’সহ বহু বই খুঁজে পেতে পড়ে ফেললাম।
বইয়ের সন্ধান পেলে কখনও পাঁচ ছয় মাইল দূরে গিয়ে, কখনও সারাদিন অপেক্ষা করে তা সংগ্রহ করে এক নাগাড়েই পড়ে ফেলি। আশ মেটে না। পরদিন আবার বইয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি।
একদিন হলো কী, আমার ক্লাসমেট মোশতাকের কাছে শুনলাম, তার বাবা তাকে মস্ত বড় একটা বাংলা ডিকশনারি কিনে দিয়েছে। হেন বিষয় নেই, যা নাকি তাতে নেই।
মোশতাকের কথা শুনে তো আমার মাথা খারাপ হওয়ার যোগাড়। আর তর সয় না। বইটা দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠলাম।
মোশতাকের বাবা মা দু’জনই শিক্ষিত মানুষ। ওদের অবস্থাও ভালো।
তখন সৈয়দপুর হাই স্কুলে পড়ি। ওদের বাড়ি স্কুল থেকে মাইল দেড়েক দূরে কঞ্চিপাড়ায়।
স্কুল ছুটির পর আর বাড়ি গেলাম না। মোশতাকের সাথে সোজা গেলাম ওদের বাড়ি।
পড়ার টেবিলে ডিকশনারিটা দেখে ওকে বললাম, দোস্ত, বইটা এক রাতের জন্য নিয়ে যাই? কালকে আবার স্কুলে নিয়ে আসবো।
মোশতাক আমতা আমতা করে বললো, দাঁড়া, মাকে জিজ্ঞেস করে আসি।
একটু পরে মোশতাকের সাথে ওর মা এসে ঘরে ঢুকলেন। আমি সালাম করলাম।
তিনি বললেন, শোনো ছেলে, ওর বাবা বইটা কেবল কিনে এনেছে। ও নিজেই বইটা এখনও ভালো করে দ্যাখেনি। ওটা এখন দেওয়া যাবে না। দেখতে চাইলে, এখানেই দেখে যাও।
মোশতাকের মা কোনো অন্যায় কথা বলেননি। কিন্তু আমি লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে লাগলাম। আমার বুকের ভেতর এক ধরনের কষ্টের কান্না ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো।
মোশতাকের মায়ের কথা অনুযায়ী ডিকশনারিটা নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে বিশাল সাইজের বইটার লাল মলাটের ভেতর ডুবে গেলাম।
শুধু শব্দার্থ নয়। এক একটা শব্দের পেছনে কত কাহিনী। কত ইতিহাস।
এক জায়গায় রাঘব শব্দের অর্থের পাশে দেখি রাম লক্ষ্মণ সীতার বনবাসের কাহিনী।
রাজা দশরথের কাছে রানী কৈকেয়ীর বর প্রার্থনা। রামের বনবাস গমন। লক্ষ্মণের ভ্রাতৃপ্রেম। রথে করে রাবণের সতীলক্ষ্মী সীতাকে অপহরণ। সীতার দুঃখ। রাম রাবণে য্দ্ধু।
আমি ঘোরের মধ্যে হাজার হাজার বছর আগের পুরাণের পঞ্চবটী বনে ঘুরতে লাগলাম।
সহসা মোশতাকের ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে দেখি ওর মা চীনামাটির প্লেটে কিছু খাবার আর স্বচ্ছ কাচের গেলাসে এক গেলাস দুধ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
বেলা ডুবে গেছে কখন খেয়াল করিনি। বাইরে বেশ অন্ধকার। বাড়ি যাওয়ার পথে বিশাল বিল। তারপর প্রকা- বাঁশঝাড়। ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠলো।
মোশতাকের মাকে বললাম, খালা, আর একদিন এসে খাবো, এখন যাই। অনেক দূর রাস্তা। মা বোধ হয় কান্নাকাটি করছে।
মোশতাকের মা নির্দেশের স্বরে বললেন, শোনো ছেলে, এগুলো খেতে হবে। নাহলে যাওয়া হবে না।
অগত্যা বিপন্ন মুখে খেতে বসলাম।
খাওয়া শেষ না হতেই তিনি একজন বয়স্ক লোককে সাথে করে এনে বললেন, এ হচ্ছে নইমুদ্দি। নইমুদ্দি তোমাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসবে। তুমি নিশ্চিন্ত মনে খাও।
আমি খাওয়া শেষ করে বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম।
সহসা মোস্তাকের মা টেবিল থেকে ডিকশনারিটা নিয়ে এসে বললেন, এটা তুমি নিয়ে যাও। তোমাকে দিলাম। মোশতাককে আর একটা কিনে দেবো।
আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। আমার বুকের ভেতর সেই কষ্টের কান্না আবার উথলে উঠলো।
বললাম, খালা, বইটা নিয়ে গেলে মা রাগ করবে। ভাববে আমি কোথাও থেকে চুরি করে এনেছি।
তিনি মৃদু হেসে আস্তে করে আমাকে বুকের কাছে টেনে নিলেন। কপালে আলতো করে চুমো দিয়ে বললেন, পাগল ছেলে! মাকে বোলো, খালা আদর করে দিয়েছে।
কান্নায় আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। এক হাতে বইটা বুকে চেপে ধরে মোশতাকের মাকে আর একবার সালাম করলাম। (চলবে …)

-লেখক: সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ
সেল: ০১৭১৫২০৫৬৭৮
মেইল: mazharmannan@gmail.com

 




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ