1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় দুপুর ১:৫১ আজ শুক্রবার, ২রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি




এক জনমের সুখ-দুঃখের ইতিকথা

  • সংবাদ সময় : শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২১
  • ১৫৬ বার দেখা হয়েছে

মাজহারউল মান্নান:

কিস্তি-০১: আমার লেখাপড়া করার কথা ছিলো না। বা’জান ছিলেন একা মানুষ। খাটা-খাটনিতে শরীরও খারাপ। সামান্য জমিজিরেত। নুন আনতে পানতা ফুরোয়। দু’বেলা খাবার জোটে না। তার আবার পড়া। এটা ছিলো সেই চল্লিশের দশকের কথা।
ক্ষেতে পাথারে বা’জানের খাবার নিয়ে যাই। হুঁকা সাজিয়ে দেই। গরু নড়াই। ছাগল চরাই। সকাল দশটার দিকে বাড়ির সামনে মাদারের ভিটার প্রাইমারি স্কুলের আশপাশে ঘুর ঘুর করি।
আমার সমবয়েসী ছেলেমেয়েরা স্কুলের মাঠে বট গাছের নিচে বসে ধূলায় দাগ দিয়ে অ আ ক খ লেখে। তেঁতুলের বিচি দিয়ে অক্ষর সাজায়।
সমস্বরে কবিতা আবৃত্তি করে, পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল…। ধারাপাত পড়ে, অ্যাকে চন্দ্র, দু’য়ে পক্ষ, তিনে নেত্র…।
আমি দূর থেকে দেখি। কখনও ওদের সাথে কণ্ঠ মেলাই। কখনো একা একা নদীর তীরে বসে বালিতে অক্ষর আঁকি।
একদিন স্কুলের পাশে আমাকে দেখে সেকেন্ড মাস্টার সোভান স্যার বললেন, এই খোকা, লেখাপড়া করবে?
হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে অস্ফুট কণ্ঠে বললাম, পড়তে মন চায় কিন্তু আমার তো বই নাই, জামাকাপড় নাই।
সোভান স্যার সেদিনই মা’র সাথে কথা বললেন।
এক দিন পর তিনি একটা শার্ট, একটা ইজার প্যান্ট আর মদনমোহন তর্কালঙ্কারের গোলাপী মলাটের একখানা ‘শিশু শিক্ষা’ এনে মা’র হাতে দিলেন।
জামাকাপড় হলো। একখানা বই হলো। কিন্তু খাতা কাগজ কালি?
বা’জান কাগজের বিকল্প হিসেবে কলাগাছের কচি পাতা কেটে সাইজ করে রোদে শুকোতে দিলেন নরম করার জন্য। সেই নরম পাতায় দাগ দিয়ে লেখার জন্য বানিয়ে দিলেন বাঁশের কঞ্চির কলম।
আগের রাতে উত্তেজনায় আমার ঘুম হলো না। পরদিন সকাল সকাল সেজেগুজে স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম।
মা বললেন, তোর বাপোক সালাম করি যা।
বা’জানের পায়ে হাত দিতেই তিনি কী একটা দোআ পড়ে আমার গায়ে মাথায় ফু দিলেন।
বললেন, বিছমিল্লাহ বলে পা বাড়াও।
প্রথম দিন স্কুলে গিয়েই দেখি, আমি সব পারি। সবার চেয়ে ভালো পারি।
দু’মাস পরেই বার্ষিক পরীক্ষা। পরীক্ষার ফিস লাগলো না। কিন্তু কষ্ট করে কাগজ কিনতে হলো। মা তেলাকুচোর রস আর ভাজা চা’লের গুড়া মিশিয়ে কালি বানিয়ে দিলেন। লেখার জন্য বেশ ক’টা বাঁশের কলম বানিয়ে দিলেন বা’জান।
প্রতিদিন পরীক্ষা দিয়ে আমি মহা আনন্দে বাড়ি ফিরি। কারণ সবকিছু আমার কাছে পানির মত সহজ মনে হয়।
প্রথম পরীক্ষাতেই ফার্স্ট হলাম। সোভান স্যার ডেকে আদর করলেন। বা’জান শুনে বিড়বিড় করে কী একটা দোআ পড়লেন। মা আনন্দে কাঁদলেন।
শুরু হলো মা’র স্বপ্ন দেখা। যে স্বপ্নের শুরু ছিলো আমার জন্মের সময় আঁতুর ঘরে। আমার কপালে একটা লাল রঙের আঁকাবাঁকা রেখার মত দাগ দেখে আমার এক জ্ঞাতি চাচা নাকি বলেছিলেন, ভাবী, তোমার ছেলেটা বিদ্বান হবে।
মা’র মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা সেই অসম্ভব স্বপ্নটাই আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো।
আমি আস্তে আস্তে ক্লাস ফোরে উঠলাম। কিন্তু অবস্থা থাকলো আগের মতই। বইপুস্তকের ঠিক নেই। খাতাপেন্সিল, কাগজকলমের টানাটানি।
এক বেলা খাবার জোটে তো আরেক বেলা উপোস।
তখন ক্লাস ফোরে ছিল বৃত্তি পরীক্ষা। প্রাইমারিতে ক্লাস ফোরই ছিল সর্বোচ্চ শ্রেণী। ক্লাস ফাইভ তখন হাই স্কুলের সাথে।
স্যাররা ঠিক করলেন আমাকে বৃত্তি দেওয়াবেন। হেড স্যার নিজের পকেট থেকে ফিসের টাকাটা দিলেন।
মায়ের উৎসাহ গেল দ্বিগুণ বেড়ে। খেয়ে না খেয়ে, ধারদেনা করে কাগজকালি কিনে দেন। এক বেলা পড়ার জন্য এর ওর কাছ থেকে বইপুস্তক চেয়ে আনেন। কখনও অন্য ছেলের বাড়িতে আমাকে নিয়ে যান পড়বার জন্য।
সবাই ভালো ব্যবহার করে না। অনেকে বিরক্ত হয়। অনেকে দরজা থেকে বিদায় করে দেয়।
এসব আমারও ভালো লাগে না। মাঝে মধ্যে আমিও বেঁকে বসি। কিন্তু মায়ের এসবে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। এত ছোটখাটো বিষয় তার স্বপ্ন স্পর্শ করতে পারে না। তিনি স্বপ্ন দেখেন তার ছেলে একদিন বড় হবে, অনেক অনেক বড়। (চলবে ..)

-লেখক: সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ
সেল: ০১৭১৫২০৫৬৭৮
মেইল: mazharmannan@gmail.com




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ