1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় রাত ১২:০২ আজ রবিবার, ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৮শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি




সত্যেন সেন:মানবতার সংগ্রামী শিল্পী

  • সংবাদ সময় : বুধবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২১
  • ৩০৪ বার দেখা হয়েছে

বাংলা সাহিত্যের এক নবধারার পথিকৃৎ সত্যেন সেন। সমাজচেতনা, মানবিকতা আর ইতিহাস চেতনার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর লেখায়। সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা ও বিজ্ঞানমনস্কতার ক্ষেত্রেও তিনি বাংলা সাহিতের অনন্য রূপকার। আর এসব কিছুই তিনি সাহিত্যে তুলে এনেছেন সাবলীলভাবে, সহজ কুশলতায় যা সহজেই পাঠককে আকৃষ্ট করেছে।
সত্যেন সেন ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ বিক্রমপুরের টঙ্গিবাড়ি থানার সোনারঙ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিল্প-সংস্কৃতি ক্ষেত্রের এক অসাধারণ ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান সত্যেন সেন। স্বনামখ্যাত আচার্য-ক্ষিতিমোহন সেন, শিশু সাহিত্যিক মনমোহন সেন, মুরারীমোহন সেন থেকে শুরু করে বর্তমান বিশ্বের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এ পরিবারেরই সন্তান। সত্যেন সেনের পুরো নাম ছিল সত্যেন্দ্র মোহন সেন, ডাক নাম লস্কর। সত্যেন সেন পড়ালেখা শুরু করেন নিজ গ্রামের সোনারঙ স্কুলে। বছর দেড়েকের বড় ভাই জিতেন্দ্র মোহন সেন শংকর ছিলেন তাঁর বাল্যসাথী। সত্যেন সেনের ঠাকুরমার পালিত পুত্র মাহাঙ্গু বানিয়া ওরফে বাউ তাদের কোলে পিঠে নিয়ে বড় করে তোলেন। বাউ প্রথমদিকে তাদের কথামালা ও সিন্দাবাদের গল্প শোনালেও পরবর্তীকালে শোনাতেন দেশপ্রেমিক বিপ্লবী ক্ষুদিরাম, সত্যেন বসু, প্রফুল্ল চাকী, বাঘা যতীন প্রমুখদের বীরত্বের কাহিনী। এসব শুনতে শুনতেই সত্যেন সেন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন। ১২/১৩ বছর বয়সেই সত্যেন সেন তাঁর বাবাকে হারান। স্কুল জীবন শেষ করে সত্যেন সেন কলকাতা চলে যান কলেজে পড়তে। সে সময়ই বিপ্লবী দল যুগান্তর-এর সাথে সত্যেন সেনের যোগাযোগ ঘটে। ঐ সময় তাঁর সাহিত্যচর্চারও সূচনা হয়।
১৯৩১ সালে সত্যেন সেন প্রথম তিন মাসের কারাভোগ করেন। একটি বাড়িতে কিছু অস্ত্রের মধ্যে তাঁর লেখা একটি চিঠি পাওয়ায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৩২ সালে আবার জেলে যান সত্যেন সেন। ঐসময় ব্যাপক পড়াশুনা করার ফলে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসেও পরিবর্তন ঘটতে থাকে। একসময় সত্যেন সেন সমাজতন্ত্রের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। ১৯৩৩ সালে তিনি আবার গ্রেফতার হন। কিছুদিন আলীপুর জেলে থাকার পর তাঁকে পাঠানো হয় বহরমপুর জেলে। সেখানেই কাটে একটানা পাঁচ বছর। একটি পাঠচক্রে যুক্ত হয়ে দীক্ষা নেন সাম্যবাদে। প্রথমবার জেলে যাওয়ার আগে বি.এ পাশ করেছিলেন। শুরু করেছিলেন ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা। কিন্তু বহরমপুর জেলে বইপত্র না থাকায় বাংলায় দিলেন এম.এ পরীক্ষা। বইপত্র সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন ছোট বেলার সাথী সেজদা শংকর। ভাষাতত্ব নিয়ে গবেষণা করবেন এ শর্তে সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ১৯৩৮ সালে সত্যেন সেন মুক্তি পান। কিন্তু সকল সুযোগ প্রত্যাখান করে কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলতে সত্যেন সেন ফিরে গেলেন নিজ গ্রামে। এ কাজের পাশাপাশি তিনি যুক্ত হন সাহিত্য-সংস্কৃতির কাজেও। ১৯৪২ সালে সোমেন চন্দ ঘাতকদের হাতে নিহত হবার পর সত্যেন সেন প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের সংগঠকের দায়িত্ব নেন। এসময় তিনি গান রচনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে রচনা করেন প্রথম গান-‘লীগ-কংগ্রেস এক হও’। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের উপর সত্যেন সেনের লেখা কয়েকটি গান খুবই জনপ্রিয় হয়। রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভক্ত সত্যেন সেন রবীন্দ্রনাথের লোকগীতির ধারাকে অনুসরণ করে অনেক গণসঙ্গীত রচনা করেন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কমিউনিস্ট পার্টির উপর প্রচন্ড নির্যাতন নেমে আসে। সত্যেন সেন আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু ১৯৪৯ সালে গ্রেফতার হন। মুক্তি পান ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৪-তে আবার গ্রেফতার। ১৯৫৫-তে মুক্তি। যুক্তফ্রন্টের শাসনামলে মুক্ত থাকলেও ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত কাটান কারাগারে। কিছু দিন বাইরে থাকার পর ১৯৬৫ সালে দেশরক্ষা আইনে আবার কারান্তরালে। পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছরের ১৩/১৪ বছরই সত্যেন সেন কারাভোগ করেন। এ সময় সত্যেন সেন কারাগারে ব্যাপক পড়াশুনা করে লেখালেখির শক্তিকে কাজে লাগাতে শুরু করেন। ৫০ বছর বয়সে সত্যেন সেন প্রকৃত লেখালেখি শুরু করলেও জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে নিরন্তর লিখেছেন। এ লেখাগুলোই তাঁর সাহিত্যিক শক্তিমত্তার পরিচয় স্পষ্ট করে। ১৯৫৮ সালে সিপাহী বিদ্রোহের উপর তিনি রচনা করেন ইতিহাস আলেখ্য ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’। ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হয় সত্যেন সেনের প্রথম উপন্যাস ‘ভোরের বিহঙ্গী’। তারপর রাজশাহী জেলে বসে লিখলেন ‘রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ’। জেলে বসে বাইবেল পড়ার পর সেখান থেকে সত্যেন সেন নির্মাণ করলেন ‘অভিশপ্ত নগরী’ এবং ‘পাপের সন্তান’-এর মত দুটি সফল উপন্যাসের কাঠামো। এম. আকবর আলীর বিজ্ঞানে মুসলমানের দান বইটি পড়ে তিনি রচনা করলেন ‘আলবেরুণী’ নামের উপন্যাস। আর জেলে বসে পকেটমারদের সাথে কথা বলে লিখলেন ‘সেয়ানা’। জেলেই পাওয়া চরাঞ্চলের কৃষকদের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখে ফেললেন ‘একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে’।
১৯৬৮ সালের প্রথম দিকে কারামুক্ত হন সত্যেন সেন। এরপর লেখালেখি ও প্রকাশনার পাশাপাশি তিনি দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। ঐ বছর প্রকাশিত হয় তাঁর বই ‘আমাদের এই পৃথিবী’ এবং ‘পাতাবাহার’। ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত তাঁর ৬টি গ্রন্থ হচ্ছে- পুরুষমেধ, আলবেরুণী, পাপের সন্তান, সেয়ানা, পদচিহ্ন ও মসলার যুদ্ধ। এসময়ই তিনি দেশের গ্রামাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনের কাহিনী সংগ্রহ করে দৈনিক সংবাদ এ নিয়মিত লিখতেন। ঢাকা শহরের প্রতিষ্ঠালগ্নের নানা কাহিনী তুলে ধরে লিখলেন ‘শহরের ইতিকথা’ বইটি। ১৯৭০ সালে সত্যেন সেনের ১১টি বই প্রকাশিত হয়। সেগুলো হচ্ছে-উত্তরণ, মা, মনোরমা মাসিমা, সাত নম্বর ওয়ার্ড, বিদ্রোহী কৌবর্ত, কুমারজীব, অভিযাত্রী, মেহনতী মানুষ, গ্রাম বাংলার পথে পথে, এটমের কথা এবং মানব সভ্যতার উষালগ্নে। ১৯৭১ সালে সত্যেন সেনের প্রকাশিত তিনটি বই হচ্ছে-একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে, অপরাজেয় এবং প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ। শেষ বইটি আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস সৃষ্টিকারী কাহিনী সংকলন। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত সত্যেন সেনের বই দুটি হচ্ছে- বিপ্লবী রহমান মাষ্টার ও জীববিজ্ঞানের নানা কথা। ১৯৭৪ সালে শহরের ইতিকথা, ১৯৭৬ সালে সীমান্ত সূর্য আব্দুল গফ্ফার খান ও বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রাম, ১৯৭৭ সালে ইতিহাস ও বিজ্ঞান ১ম খন্ড, ১৯৭৯ সালে ইতিহাস ও বিজ্ঞান ২য় খন্ড প্রকাশিত হয়। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বিরামহীনভাবে লিখে গেছেন সত্যেন সেন।
দেশের কৃষক-শ্রমিকদের সংগঠিত করার পাশাপাশি সত্যেন সেন দেশের শিল্পী সাহিত্যিকদের সংগঠিত করতে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন। একটি জাতীয়ভিত্তিক প্রগতিশীল গণসাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন সত্যেন সেন। ১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর তাঁর হাতেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটে। গড়ে উঠে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব নেন শিল্পী-সংগ্রামী সত্যেন সেন। অন্যান্যদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন আদর্শভিত্তিক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। বাঙালির অসা¤প্রদায়িক, মানবিক চেতনাসমৃদ্ধ সংস্কৃতি বিকাশে উদীচীর তিন শতাধিক শাখার দশ সহস্রাধিক সাংস্কৃতিক কর্মী আজও সত্যেন সেনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করছে। তাঁর লেখা ও গান আজও সকলকে সমানভাবে অনুপ্রাণিত করছে।
সত্যেন সেনের প্রথম গ্রন্থ ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’ প্রকাশের সময় তাঁর বয়স ছিল ৫১ বছর। তার পর বেঁচেছিলেন ২২ বছরেরও কম সময়। কিন্তু এত অল্প সময়ে তাঁর লেখার সংখ্যা এবং বিষয় বৈচিত্র্য আমাদের আশ্চর্য না করে পারে না। আমরা বিস্মিত হই তাঁর অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, মেধা এবং লেখক শৈলীর সাবলীলতার অপূর্ব সমন্বয়ে। তাঁর বহুমুখী জ্ঞান এবং লেখায় তার প্রয়োগের অসাধারণ ক্ষমতা আমাদের মুগ্ধ করে। সত্যেন সেন ১৯৬৯ সালে পাপের সন্তান উপন্যাসটির জন্য আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং মৃত্যুর পর ১৯৮৬ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
সত্যেন সেন কখনই খুব সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন না। কারা জীবনে আক্রান্ত হন হাঁপানিতে। দৃষ্টিশক্তিরও সমস্যা ছিল। একাত্তর পরবর্তীকালে এ দুটি সমস্যাই প্রকট আকার ধারণ করে। তারপরেও তিনি সাহায্যকারীর সহায়তায় পড়া এবং লেখা অব্যাহত রাখেন। অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে সত্যেন সেন ভারতে বোন প্রতিভা সেনের কাছে চলে যেতে বাধ্য হন। সেখানেই ১৯৮১ সালের ৫ জানুয়ারি অসাধারণ এ মানুষটির জীবনাবসান ঘটে। বিরল প্রকৃতির মানুষ সত্যেন সেনের গোটা জীবনটাই নিবেদিত ছিল মানুষের কল্যাণে। তাই তিনি গভীর প্রত্যয়ে উচ্চারণ করেছিলেন-

মানুষের কাছে পেয়েছি যে বাণী
তাই দিয়ে রচি গান
মানুষের লাগি ঢেলে দিয়ে যাবো
মানুষের দেয়া প্রাণ।
লেখক: জহুরুল কাইয়ুমঃ শিক্ষক ও সংস্কৃতিকমী




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ