1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় রাত ১১:৩৩ আজ শুক্রবার, ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি




বাংলাদেশের পতিতাপল্লীর দুঃখগাঁথা

  • সংবাদ সময় : শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২০
  • ৯৭ বার দেখা হয়েছে

ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশে যৌনকর্মীরা বৈষম্যের শিকার। সমাজের মূলধারা থেকে তাদেরকে আলাদা করে দেখা হয়। সমাজের চোখে যৌনকর্মীদের কোনো সম্মান থাকে না। তারা সব সময়ই সামাজিক অসম্মানের মুখোমুখি হন। সম্মানজনক ব্যক্তি হিসেবে তাদেরকে দেখা হয় না। বাংলাদেশে এই পেশাকে দেখা হয় চরিত্রহীনদের কাজ হিসেবে। পরিবারসহ সমাজের কেউই তাদেরকে গ্রহণ করতে চায় না। কারণ, তারা সমাজ ও সংসাদের জন্য লজ্জা বয়ে আনেন।

এক্ষেত্রে পতিতাবৃত্তি শব্দটাকেও ব্যবহার করা হয় অসম্মান অর্থে। যে সমাজের সদস্যরা এসব যৌনকর্মীর সেবা নেন, তারা পর্যন্ত এই পেশাকে কলঙ্কিত করেন। এদের নিয়ে খারাপ খারাপ কথা বলেন। বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি নিয়ে বিদেশি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে এসব কথা বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, কাঙ্খিত কোনো পেশা পতিতাবৃত্তি নয়। অনেক পতিতাই এই পেশা ছেড়ে জীবনকে বাঁচাতে চান। মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন টেরে ডেস হোমসের মতে, দরিদ্র্যতা, বঞ্চনা, জুলুম এবং নির্যাতানের শিকার হয়ে যৌনকর্মে পা বাড়ান যৌনকর্মীরা। এমনকি কিছু নারীর সামনে উজ্বল ভবিষ্যত থাকা সত্ত্বেও তার জীবন বিক্রি হয়ে যায় পতিতাবৃত্তিতে। যেসব নারী বিক্রি হয়ে যান তারা হন বন্ডেড প্রস্টিটিউট। এসব নারীর কোন স্বাধীনতা থাকে না বললেই চলে। নিজেদেরকে মুক্ত করার জন্য তাদেরকে প্রচুর অর্থ আয় করতে হয়। এরপরই তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, এই পেশা ছেড়ে যাবেন নাকি আত্মনির্ভরশীল হবেন। তবু তাদের বিগত জীবনের পচে যাওয়া অধ্যায়ের কারণে নতুন করে জীবন শুরু করা খুবই কঠিন। তাদের সঙ্গে সঙ্গে যেন কলঙ্কও ছুটতে থাকে। এ জন্য সমাজ তাদেরকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে পতিতাপল্লীতে ফিরে যান জীবন বাঁচানোর তাগিদে। তাদেরই একজন বলেছেন, যদি আমার মৃত্যুও হয় এতে, তবু আমি পরোয়া করি না। আমাকে তো অর্থ উপার্জন করতে হবে।
অনেক যৌনকর্মী গবাদিপশু মোটাতাজাকরণ পিল ওরাডেক্সন সেবন করেন। এর ফলে তাদের শারীরিক গঠন আকর্ষণীয় হয়। এতে খদ্দের আকর্ষিত হয়। তারা অধিক অর্থ আয় করতে পারেন। কিন্তু এই ওষুধ দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে তাদের বিভিন্ন অঙ্গ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু পতিতাপল্লীর নারীরা এ ঝুঁকির কথা জানা সত্ত্বেও তা সেবন করেন।
বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী যৌনকর্ম। তবে ২০০০ সালে যৌনকর্মকে বৈধতা দিয়েছে হাইকোর্ট। সে অনুযায়ী একজন যৌনকর্মীর ন্যূনতম বয়স হতে হবে ১৮ বছর এবং নিজেই নিজেকে পতিতা হিসেবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ঘোষণা দিতে পারেন। ফলে তারা যৌনকর্মী হওয়ার পেশা নিজেরাই স্বাধীন ইচ্ছার ওপর বেছে নিতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের যৌনকর্মীরা এ পেশায় আসেন তাদের অসহায়ত্বের কারণে। তারা বেঁচে থাকার জন্য এ পেশা বেছে নেন। আদর্শগতভাবে তারা এটা বেছে নিতে চান না। তাদের কাছে এ পেশা একান্তই জীব বাঁচানোর অপরিহার্য মাধ্যম। ব্যক্তিগত সুখ বা আনন্দ পাওয়ার জন্য তারা এ পেশায় আসেন না। তাদের কাছে পতিতালয় হলো জেলখানা। সেখানে বয়সের কোনো ফারাক নেই। সবাইকে জীবন গঠনের জন্য এই পেশায় কাজ করতে হয়। বাংলাদেশের আইনে অপ্রাপ্ত বয়সী মেয়েদের যৌনকর্মে প্রলুব্ধ করা অথবা একাজে তাদেরকে বিক্রি করে দেয়া বৈধ নয়। ৩৬৪এ, ৩৬৬এ এবং ৩৭৩ ধারা অনুযায়ী এসব কাজ ফৌজদারি অবরাধ এবং এতে মৃত্যুদ-ের সম্ভাবনা আছে।
কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় পতিতালয়গুলোর অন্যতম দৌলতদিয়া পতিতালয়। সেখানে বয়স কোনো ব্যাপারই নয়। গড়ে সেখানে নতুন পতিতাদের বয়স ১৪ বছর। এর কারণ, মানবপাচার। বিশেষ করে শিশুদের পাচার করে নিয়ে যৌনকাজে বিক্রি করে দেয়া। এ জন্য অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালিকাদের অপহরণ করে বাংলাদেশের বিভিন্ন পতিতালয় অথবা হোটেলে আটকে রাখা হয়। তাদের কাউকে কাউকে সৎমা অথবা প্রেমিক বিক্রি করে দেয়। অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের বাংলাদেশে যৌনকর্মে বিক্রি করে দেয় তার নিকটতম আত্মীয়রা। আবার এসব মানুষই তাদেরকে নিয়ে উপহাস করে এবং সমাজের বাইরে রাখে। এতে সমাজে যৌনকর্মীদের প্রতি যে মনোভব তার একটা হীনতা প্রকাশ পায়। যৌনকর্মীদের সম্মান দেখাতে অস্বীকৃতি করে যে সমাজ, সেই সমাজের ব্যক্তিরাই এই পেশার সার্ভিস নেয়।
ইউএনএইডসের ২০১৬ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে কমপক্ষে এক লাখ ৪০ হাজার যৌনকর্মী আছেন। তার মধ্যে প্রায় ১৬০০ নারী দৌলতদিয়ায় যৌনকর্মে লিপ্ত। তাদের বেশির ভাগই অপ্রাপ্ত বয়স্ক। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে চোখ বন্ধ করে আছে। এই দৌলতদিয়ায়ই জন্ম নেয় অনেক যুবতী। তাদেরকে পরিবারের সদস্যরা যৌনকর্মী হিসেবেই বড় করে তোলে। বাকিদেরকে পাচার করে নেয়া হয় এবং তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে পতিতালয়ের মালিক ‘ম্যাডাম’। যখন অল্প বয়সীদের অপহরণ করা হয় তাদের বেশির ভাগকেই যৌন বাণিজ্যে পাচার করা হয়। এসব বিপন্ন শিশুদের সহায়তা করার পরিবর্তে লোকজন তাদেরকে দেখে লজ্জাহীন হিসেবে। আর এর মধ্য দিয়ে তাদেরকে বিপথগামী হতে অনুমোদন দেয়া হয়।
পতিতাপল্লীতে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের চাহিদা বেশি। তাদের মূল্যও বেশি। কারণ তারা বেশি ইয়াং থাকে এবং কুমারী থাকে। এসব বালিকার অবমাননা সত্ত্বেও তারা কতটা খাঁটি তার মূল্যায়ন করার চেষ্টা করে তারা। অধিক যুবতী যৌনকর্মীদের কাছ থেকেই দেহসঙ্গ ভোগ করতেই পছন্দ করেন খদ্দেররা বেশি। অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যৌনকর্মীদের চাহিদা কমতে থাকে। তাদের খদ্দের কমতে থাকে। এর ফলে তাদের আয়ও কমে যেতে থাকে। দৌলতদিয়া পতিতালয়ের পতিতারা ভাড়া পরিশোধ করেন। নানা রকম বিল পরিশোধ করেন। এ ছাড়া আরো কিছু খরচপাতি আছে। এসব খরচ কাটিয়ে তাদেরকে জীবনধারণ করতে হয়। সন্তানদের লালন পালন করা হয়। যখনই বয়স বেড়ে যাওয়া পতিতাদের খদ্দের কমতে থাকে, এর প্রভাব পড়ে তাদের জীবন ধারণের ওপর।
এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশে রয়েছে বাল্য বিয়ের সর্বোচ্চ হার। এসব বালিকার বেশির ভাগের বয়স ১৫ বছরের কম। কিন্তু পতিতাপল্লীতে নিয়োজিত এসব অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালিকার বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে শিশুদের দিকে কুদৃষ্টি নিয়ে যৌনচক্রের অসাধু ব্যক্তিরা সুবিধা পাচ্ছে। তারা ১০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের প্রতি হাত বাড়ায়।
যৌনকর্মীদের কলঙ্কা তাদের সন্তানদের ওপরও প্রভাব ফেলে। যখন তাদের কেউ সন্তান সম্ভাবা হন তখন তিনি মনে করেন, তার একটি মেয়ে হলে তাকে যৌনকর্মী বানানো যাবে। এতে বাড়তি অর্থ আসবে। তাই দৌলতদিয়ায় একটি কন্যাশিশু জন্মগ্রহণ করলেই তার ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই কন্যা শিশুদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান তার পিতা। দক্ষিণ এশিয়ায় এ জন্য মেয়ে সন্তানের চাহিদা সংসারে কম। দেখা গেছে, একটি বালিকা ১২ বছর বয়সেই যৌনকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করে। সমাজ তাকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করে। এসব কথা একজন অল্প বয়সী যৌনকর্মীর ভাইয়ের ।
যৌনকর্মীদের শিক্ষার ক্ষেত্রে রয়েছে বিধিনিষেধ। যৌনকর্মীদের সন্তানরা যে স্কুলে যায় সেই একই স্কুলে দৌলতদিয়া এলাকার পিতামাতারা তাদের সন্তানদের পাঠান না। ১৯৯৭ সালে সেভ দ্য চিলড্রেন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে। দৌলতদিয়া পতিতালয়ে জন্মগ্রহণ করেছে এমন শিশুদের জন্য মুলত এই স্কুল। এই স্কুলে পড়াশোনা ও উন্নত জীবনের সুযোগ এনে দেয়। কম বয়সী মেয়ে ও ছেলেরা এখন আর যৌনজীবনে বাধ্য নয়। এই স্কুলের মাধ্যমে তাদেরকে যৌনজীবন এবং মাদক থেকে দূরে রাখা গেছে। তা সত্ত্বেও এসব ছেলেমেয়ের বিরুদ্ধে বৈষম্য বন্ধ করা যায় নি। তাদেরকে নিয়ে উপহাস করা হয়। তারা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। তাদেরকে পতিতার সন্তান এমন বাক্য শুনতে হয়। এর ফলে ওইসব শিশু মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এ জন্য সেখানে দৌলতদিয়ার অবসরপ্রাপ্ত যৌনকর্মীদের নিয়োগ দিয়েছে এই স্কুল। তারা যৌনকর্মীদের এই পেশা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিচ্ছেন।




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ