1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় বিকাল ৩:৪৮ আজ শুক্রবার, ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি




শিক্ষকতা জীবনের ফেলে আসা দিনগুলি-মাজহারউল মান্নান

  • সংবাদ সময় : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২০
  • ১০৮ বার দেখা হয়েছে

সত্যিকার শিক্ষক বলতে যা বুঝায় আমি মোটেও তা নই। একজন শিক্ষকের যে পরিমাণ জ্ঞানগরিমা থাকা দরকার তার সামান্যও আমার মধ্যে নেই। লোকজন সাধারণভাবে মাস্টার বলতে যা বুঝায় আমি তেমনই একজন সাধারণ মাস্টার মাত্র। অবশ্য মাস্টার শব্দের অর্থ ভিন্ন। সেটা এখানে আলোচ্য বিষয় নয়।
আমরা সেই ছোটবেলায় দেখেছি গাঁওগেরামের মানুষ স্কুল পর্যায়ের শিক্ষকদের নিজেদের মতো করে দুই ভাগে ভাগ করে নিয়েছে। প্রথম ভাগে যারা পড়েন তারা হলেন পÐিত আর দ্বিতীয় ভাগে যারা পড়েন তারা হলেন মাস্টার। পÐিতস্যারদের প্রতি একটু আলাদা শ্রদ্ধা-সমীহ দেখাতো মানুষ। তারা বিশেষ জ্ঞানী মানুষ বলে পরিচিত ছিলেন এলাকায়। আর মাস্টার স্যাররা ছিলেন অনেকটা কাছের লোক, ঘরের মানুষ। বিপদে-আপদে, প্রয়োজনে-অপ্রয়েজনে ডাকলেই তাদের পাওয়া যায়। আদেশ-উপদেশ-পরামর্শ তারা উপযাচক হয়েই দেন।

আমি চিন্তা করে দেখেছি, এর একটির মধ্যেও আমি পড়ি না। মানুষ উটকো কাউকে দেখলে বলে না, বারো নয় তের নয় মধ্যতে চৌদ্দ, আমার মনে হয় আমি সেই ‘মধ্যতে চৌদ্দ’। শেষ মোগল স¤্রাট কবি বাহাদুর শাহ’র শেষ জীবন ছিলো খুব করুণ, খুব কষ্টের। তিনি দুঃখ করে তাঁর এক শায়েরিতে বলেেেছন,
না কিসিকা আঁখকা নুর হুঁ
না কিসিকা দিলকা কাঁড়ার হুঁ,
যো কিসিকা কাম না স্যকে
ওই ম্যাঁয় এক মুশত গুবার হুঁ।।
না হ’লাম কারো নয়নের আলো
না হলাম কারো হৃদয়ের কাÐারী
যে কারো কাজেই লাগলো না
আমি তেমনি এক-মুষ্ঠি পথের ধুলি।।
আমার মনে হয় আমি বাহাদুর শাহ্র গজলের সেই এক ‘মুশত গুবার’ বৈ অন্য কিছু নয়।

গোড়ার কথায় আসি। ১৯৬৬ সালের শেষ দিকে মাস্টার্সের মৌখিক পরীক্ষা দিচ্ছিলাম রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে। বহিরাগত পরীক্ষক হিসেবে ঢাকা থেকে এসেছেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। আমরা যারা পরীক্ষা দিচ্ছিলাম শুধু তারাই নয়, সেই সময়ের জাঁদরেল স্যারদেরও কাঁপ কাঁপ অবস্থা। কারণ ডক্টর শহীদুল্লাহ্ ছিলেন তাঁদেরও শিক্ষক। তাঁর ব্যক্তিত্ব এমনই ছিলো যে তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস কারো ছিলো না। পরীক্ষা কক্ষে বিভাগীয় প্রধান ড. মযহারুল ইসলাম স্যার আমাকে একটু সহায়তা করতে ধরেছিলেন আর অমনি শহীদুল্লাহ্ সাহেব তাঁকে এমনভাবে তিরস্কার করলেন যে তিনি মাটির সাথে মিশে যেতে লাগলেন।

ভাইবা দিয়ে শুকনো মুখে বেরিয়ে এসেই দেখি পোস্টাফিসের পিয়ন দাঁড়িয়ে আছে আমার অপেক্ষায়। ডিপার্টমেন্টের ঠিকানায় আমার একটা রেজিস্ট্রি করা চিঠি। খাম খুলেই দেখি গোবিন্দগঞ্জ কলেজের প্রিন্সিপাল সিরাজুল হক সাহেবের চিঠি। সিরাজ ভাই আমাদের চেয়ে বেশ সিনিয়র। আমার সাথে তার পরিচয় অনেক দিনের। আমরা অনেক দিন একসাথে প্রোগ্রাম করেছি রংপুর রেডিওতে। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, পরীক্ষা দিয়ে তুমি আমার এখানে চলে আসো। আপাতত পড়াও। তারপর রেজাল্ট বেরোলে তোমার নিয়োগের ব্যবস্থা করে ফেলবো। সিরাজ
ভাই নিজেও বাংলার লোক। তিনি এখন গোবিন্দগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ। তাই তার স্থলে বাংলার একজন শিক্ষক দরকার। সে সময় থানা পর্যায়ে কলেজগুলোতে এভাবেই শিক্ষক সংগ্রহ করা হতো। বিশেষ করে ইংরেজির শিক্ষক পাওয়া ছিলো খুবই দুস্কর।
রাজশাহী থেকে ট্রেনে ফেরার পথে কাগজে দেখলাম একই থানায় দুটো নতুন কলেজের শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। একটা সাদুল্লাপুর সদরে আর একটা নলডাঙ্গায়।
বাড়িতে এসে খবরটা দিতেই বা’জান বললেন, বাড়ির কাছেই যখন কলেজ হচ্ছে তখন আর অতো দূরে গোবিন্দগঞ্জ যাওয়ার দরকার কি। আমি একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হলাম যে একটা কলেজে চাকরি পাওয়া আমার জন্য কঠিন হবে না। তাছাড়া এ তল্লাটে বাংলায় এম এ আর একজনও ছিলো না। আমি দুই জায়গাতেই আবেদন করলাম।
ছোটবেলা খুব দুঃখ কষ্টে লেখাপড়া করতে গিয়ে আমার বার বার মনে হয়েছে কোনো রকমে সেভেন এইট পাশ করতে হবে। সে সময় আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিলো কোনো রকমে সেভেন এইট পাশ করে অফিস আদালতে পিয়নের একটা চাকরি যোগার করা। সংসারের যে হাল তাতে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয় আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আমাদের পাশের গ্রাম ধুতিচোরার মফিজল ভাই ছিলেন অ্যাকোয়ার্ড স্টেট অফিসের পিয়ন। তিনি ছিলেন আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। লম্বা-চওড়া ঝাঁকড়া চুলের মফিজল হক ভাই সার্ট পাজামা পরে প্রতিদিন শহরে আসতেন সাইকেলে চড়ে। সকাল সন্ধ্যায় তার বাড়িতে মানুষ জনের ভিড়। জমাজমির নানা তদবির নিয়ে আসে তারা। এই চাকরি করে সংসারের আয় অবস্থাও ফিরিেিয়ছেন তিনি। বাড়িতে দুই তিনটা টিনের ঘর। দুই জোড়া হালের গরু। বাড়ির ভেতর পেটিকোট-বøাউজপরা বউ-ঝি। ঘরের ভেতর টেবিল-চেয়ার। তার ওপর আমাদের গ্রামের সখের থিয়েটারে তিনি ছিলেন নায়ক। গ্রামে তার অন্য রকম মর্যাদা।

এসব দেখে শুনে আমার মনে হতে লাগলো আমার এরকম একটা চাকরি হলে বেশ হয়। তাতে সংসারে সাহয্য করা যাবে। গ্রামে মানমর্যাদাও বাড়বে। আমি স্বপ্ন দেখেতে লাগলাম আমি কোনো একটা অফিসের পিয়ন হবো। এই উদ্দেশ্যে আমি কিছুদিন মফিজল ভাইয়ের পিছে পিছে ঘুরলাম। তার ফাই-ফরমাস খাটলাম। তিনি কথাও দিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু হলো না। জানি না, সেদিন যদি আমি একটা পিয়নের চাকরি জোটাতে পারতাম, তাহলে আমার ভাগ্যটা কেমন হতো?
আবেদন করার অনেক পরে ১৯৬৭ সালের ২৫ এপ্রিল ইন্টারভিউ কার্ড পেলাম নলডাঙ্গা কলেজের। সাদুল্লাপুর কলেজের কি হলো সেটা তখনও জানি না। একই থানায় দুটো নতুন কলেজের শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বেরিয়েছিলো একই সাথে। ইন্টারভিউ কার্ডে কলেজের সভাপতি, গাইবান্ধা মহকুমার এসডিও’র পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন কলেজের সম্পাদক সাদুল্লাপুর থানার সিও ডেভ (সার্কেল অফিসার ডেভেলোপমেন্ট) মোজাহারুল হক। তিনিই তখন থানা (আজকের উপজেলা) পর্যায়ের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা। এখনকার ইউএনও। অবশ্য থানা পর্যায়ে আরও একজন সিও ছিলেন। তাকে বলা হতো সিও রেভ। সার্কেল অফিসার রেভিনিউ।

মে মাসের ১ তারিখ। বিশ^ শ্রমিক দিবস। ঠিক সেদিন চাকরির জন্য আমার জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ। ইন্টারভিউ এসডিওর চেম্বারে। বর্তমান শিল্পকলা ভবনের সামনের লাল দালানটাই ছিলো এসডিওর অফিস। সে সময় এসডিও ছিলেন নাজেম আহমেদ চৌধুরী সিএসপি। খুব সুন্দর চেহারার এই মানুষটাকে দেখলে মনে হতো বম্বে সিনেমার নায়ক।
প্রায় বিষয়ে কেন্ডিডেট এসেছে তিন থেকে চার জন। ইংরেজির কেউ আসেনি। বাংলার আমি একা। আমি ছাড়া শুধু বাংলা নয়, এ অঞ্চলের কেউ কোনো বিষয়েরই প্রার্থী ছিলো না। ইন্টারভিউ বোর্ডে বেশিরভাগই ছিলেন গাইবান্ধা কলেজের শিক্ষক। তাঁরা আমাকে কোনো কথাই জিজ্ঞেস করলেন না। বাংলার আবুল হাসান শামসুদ্দিন স্যার বললেন, ও তো আমাদেরই ছাত্র, যতটুকু জানি ও পারবে, কোনো অসুবিধা হবে না। এই বলে তিনি সোজা আমাকে বললেন, ঠিক আছে, তুমি যাও। খুব সহজেই নলডাঙ্গা কলেজে আমার চাকরিটা হয়ে গেল। জুন মাসের ২ তারিখে দস্তখত করা নিয়োগপত্র আমি পেলাম ৪ তারিখে। বেতন ৩০০ টাকা, সাথে ৩০ টাকা মহার্ঘভাতা। মোট ৩৩০ টাকা। বর্তমান টাকার মূল্যমাণে প্রায় লাখখানেক টাকার কাছাকাছি। বা’জানকে নিয়োগপত্রটা দেখতেই তিনি বিস্মিত হয়ে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, বাবা, আল্লাহ্ পাকের কাছে শোকর গোজারি করো। (পর্ব-০১, চলবে)




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ