1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় সকাল ৯:০০ আজ বৃহস্পতিবার, ১৪ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৯শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৭ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি




লড়াকু বাঙালির প্রতিকৃতি কামাল লোহানী

  • সংবাদ সময় : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২০
  • ২০০ বার দেখা হয়েছে

জহুরুল কাইয়ুম:

এক.
সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শব্দসৈনিক, সংগঠক এগুলোর সবকটি অভিধা দিয়েও কামাল লোহানীকে পুরোটা বুঝানো সম্ভব নয়। কারণ এত বহুমাত্রিক কাজ তিনি করেছেন বা কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন যে তাঁকে কোনো নির্দিষ্ট পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা অন্যায় হবে। অন্যদের লেখালেখি থেকে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনের সময় আর ২০১২ সাল থেকে উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটিতে একসাথে কাজ করার সুবাদে তাঁকে কিছুটা জেনেছি। দেশ ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ও গভীর মমত্ববোধ থেকে কল্যাণমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। তাই যখন যেখানে মনে করেছেন ছুটে গেছেন, যুক্ত হয়েছেন, প্রয়োজনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন। আজকের প্রজন্মের মানুষদের অনন্য লড়াকু, দেশপ্রেমিক, সব্যসাচী এই মানুষটির কথা জানাতেই আমার সামান্য লেখার প্রয়াস।

দুই.
১৯৩৪ সালের ২৬ জুন তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার খান সনতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কামাল লোহানী। পারিবারিক নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী, মা রোকেয়া খান লোহানী। মাত্র ৬/৭ বছর বয়সে মাতৃহারা হলে বাবা তাঁকে পাঠিয়ে দেন কলকাতায় নিঃসন্তান ফুফু সালেমা খানমের কাছে। সেখানে তিনি দেখলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর দেশ বিভাগের উন্মাদনা। দেশ ভাগের পর চলে এসে ভর্তি হলেন পাবনা জিলা স্কুলে। ১৯৫২ সালে সেখান থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করে ভর্তি হলেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। সেখানে যুক্ত হয়ে গেলেন ছাত্র রাজনীতির সাথে। তারপর রাজনীতি, কারাবরণ, আত্মগোপনে থাকা ইত্যাদি মিলিয়ে আগামীর পথ খুঁজে নিলেন দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদনের।

তিন.
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য যখন রক্ত ঝরলো সেদিনই প্রতিবাদ মিছিলে যুক্ত হয়ে কামাল লোহানী রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করলেন। ১৯৫২ সালের নভেম্বরে রণেশ মৈত্র, আব্দুল মতিন, কামাল লোহানী মিলে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের পাবনা জেলার সাংগঠনিক কমিটি গঠন করলেন। সংগঠনের ব্যপ্তি ঘটালেন গোটা জেলায়। একসময় অনুষ্ঠিত হলো এডওয়ার্ড কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচন। ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষের এই নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের প্যানেল একটি বাদে পুরো কেবিনেটে জয়লাভ করে। ১৯৫৩ সালে পাবনায় মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে যোগ দিতে আসেন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ঢাকায় ছাত্র হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত নূরুল আমিনসহ নেতৃবৃন্দ। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করায় অন্যান্যদের সাথে প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হয়ে সাতদিন কারাভোগ করেন কামাল লোহানী। ১৯৫৪ সালে মার্চে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে সব প্রগতিশীল ছাত্রই যুক্তফ্রন্টের পক্ষে কাজ করেন। ওই বছর ২১ফেব্রুয়ারিতে বিশাল গণজমায়েত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় পাবনাতে। এতে শংকিত হয়ে অনেককে গ্রেফতার করা হয়। কামাল লোহানীও আবার গ্রেফতার হয়ে একমাস কারাভোগ করেন। কলেজ ছুটি থাকায় তিনি গ্রামের বাড়িতে চলে যান। যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। কিন্তু ২৯ মে ওই সরকার ভেঙে দিয়ে পূর্ব বাংলায় গভর্ণর নিয়োগ দেয়া হয়। ১জুন গ্রামের বাড়ি থেকেই আবার গ্রেফতার করা হয় কামাল লোহানীকে। পাবনা জেলা কারাগারে কিছুদিন রাখার পর পাঠানো হয় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখান থেকে মুক্তি লাভ করেন ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে। এভাবেই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু রাজশাহী কারাগারে থাকার সময় তিনি দীক্ষা নেন মার্কসবাদের। ওই কারাগারে তখন ছিলেন অনেক কমিউনিস্ট নেতা। এই আদর্শিক কারণেই পারিবারিক সিদ্ধান্তের বাইরে তিনি ঢাকায় চলে গেলেন। চাচাতো ভাই ফজলে লোহানীর সহায়তায় মাসিক ৮০ টাকা বেতনে দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় সহসম্পাদক হিসেবে যোগদান করে সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা করলেন। ১৯৫৫ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগদানের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

চার.
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে অন্য অনেকের মত কামাল লোহানীও আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। পরিস্হিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবার সংবাদপত্রের কাজে যোগ দেন। ওই সময় নৃত্যগুরু জি এ মান্নান এর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে তা দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ করেন। তখন থেকে শুরু হয় তাঁর জীবনের সাংস্কৃতিক অধ্যায়। ছাত্র ইউনিয়ন করার সময় উপস্থাপনা ও আবৃত্তির যে শিক্ষা নিয়ছিলেন সেটার সাথে যুক্ত হলো নৃত্য। বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নৃত্য শেখা শুরু করলেন। জি এ মান্নানের প্রযোজনায় ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ নৃত্যনাট্যের ছেলে চরিত্রে অংশ নিলেন কামাল লোহানী। এই নৃত্যনাট্য নিয়ে ১৯৫৯ সালে দলটি পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ এবং ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে তিনি ইরান ও ইরাক সফর করেন। এভাবেই সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে যুক্ত হলেন কামাল লোহানী এবং পরবর্তীকালে সেটাই তাঁর নেশায় পরিণত হলো। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে নানা সাংগঠনিক কাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। আয়োজনের অংশ হিসেবে ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যে বজ্রসেনের ভূমিকায় অংশ নিয়ে প্রশংসিত হলেন। ষাটের দশকে পন্ডিত বারীণ মজুমদারের উদ্যোগে মিউজিক কলেজ প্রতিষ্ঠা, তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৯৭০ সালে ‘প্রথম পাকিস্তান সঙ্গীত সম্মেলন’ এবং ১৯৭২ সালে আলাউদ্দিন সঙ্গীত সম্মেলন আয়োজনের সকল কর্মকা-ে কামাল লোহানী সম্পৃক্ত থেকে সর্বাত্মক সহোযোগিতা করেছেন। এগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে দক্ষ সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে গড়ে তোলেন।

১৯৬২ সালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন শুরু হলো। সোহরাওয়ার্দী গ্রেফতার হলেন, অনেকের সাথে কামাল লোহানীর নামেও হুলিয়া জারি করলো সামরিক শাসকরা। ১৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ থেকে কাজ শেষে ঘরে ফেরার পথে গ্রেফতার হলেন তিনি। এই সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, আবুল মনসুর আহমেদ, রণেশ দাশগুপ্ত, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, কফিল উদ্দিন চৌধুরী, ছাত্রনেতা হায়দার আকবর খান রনো, শেখ মনি, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, শ্রমিকনেতা নাসিম আলী প্রমুখ। বঙ্গবন্ধুসহ অনেকের সাথেই কামাল লোহানী ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পান। সাড়ে তিন মাস পরে তিনি মুক্তিলাভ করেন।

পাঁচ.
১৯৬২ সালে কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি আবার সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে যুক্ত হন।রবীন্দ্র গবেষক ও সাংবাদিক ওয়াহিদুল হকের আহ্বানে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’ এর সাথে যুক্ত হন এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাড়ে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন। নীতিগত কারণে ছায়ানট ছেড়ে মার্কসবাদী আদর্শে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী। এবছরই পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য দিলে সাংস্কৃতিক কর্মীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ওয়াহিদুল হক ও কামাল লোহানী যুগ্ম আহ্বায়ক হয়ে গঠন করেন ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা পরিষদ’। এই সংগঠনের উদ্যোগে সেই সময় তিন দিনব্যাপী রবীন্দ্র অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। ১৯৭১ সালের মার্চে সাংস্কৃতিক সংগঠন ও কর্মীদের সংগঠিত করে তাঁরা গঠন করেন ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ নামে ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে ভারতে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে যুক্ত হন। সংবাদ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেলেও তিনি কেন্দ্রের নানা ধরনের কাজে ভূমিকা রেখেছিলেন। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয়বার্তা লিখেছিলেন কামাল লোহানী। আর সেই প্রথম বার্তাটি বিশ্ববাসীর কাছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে তাঁর কন্ঠেই পৌঁছে যায় – ‘আমরা বিজয় অর্জন করেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।’ এ এক অনন্য গৌরব তাঁর জন্য। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকারের ঢাকা আগমন এবং ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন অনুষ্ঠান দুটির ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন কামাল লোহানী। ১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বেতার ঢাকার দায়িত্ব নিয়ে বিধ্বস্ত বেতারকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর সাথে মতবিরোধ হওয়ায় ষোল মাস পর তিনি ওই দায়িত্ব ছেড়ে দেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মহাজোট সরকার গঠন করলে তিনি আবার দুই বছর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে রাজশাহী আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রথম সভাপতি ছিলেন। কামাল লোহানী ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্হা গঠন করেন এবং সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দেশের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে ২০১২ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চার বছর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান, একুশের চেতনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক, স্বাধীন বাংলা বেতার পরিষদের উপদেষ্টা, একাত্তরের ঘাতক- দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা, ব্রতচারী বাংলাদেশ এবং নব নাট্য সংঘ-এর সভাপতি ছিলেন। কামাল লোহানী ‘আমার বাংলা’ নামে শিল্প-সংস্কৃতি গবেষণা ও অনুশীলন চক্র গঠন করেছিলেন।

ছয়.
১৯৫৫ সালে ঢাকায় গিয়ে টিকে থাকার জন্য দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার মাধ্যমে পেশাগত জীবনের শুরু হয় কামাল লোহানীর। তারপর দৈনিক আজাদে কাজ করেন। ১৯৬২ সালে কারামুক্তির পর সেপ্টেম্বরে যোগ দিলেন দৈনিক সংবাদ -এর সিনিয়র সাব এডিটর পদে। অল্প দিনেই দায়িত্ব পেলেন শিফট ইন চার্জের। ১৯৬৬ সালে ‘পাকিস্তান ফিচার সিন্ডিকেট’ এবং ১৯৬৯ সালের প্রথম দিকে কিছুদিনের জন্য দৈনিক পয়গাম-এ কাজ করেন। ১৯৬৯ সালে যোগ দেন দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার শিফট ইনচার্জ হিসেবে। পরে চিফ সাব এডিটর পদে উন্নীত হন। এই সময়কালে তিনি দুইবার সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে কামাল লোহানী পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পরবর্তী উত্তাল সময়ে তিনি ফয়েজ আহমেদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক স্বরাজ পত্রিকায় কয়েকটি অসাধারণ প্রতিবেদন লিখেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি যোগ দেন নতুন পত্রিকা দৈনিক জনপদ-এ। সেবছর তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে দৈনিক জনপদ ছেড়ে দৈনিক বঙ্গবার্তা-য় যোগদান করেন। তিন মাস পর পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে কামাল লোহানী দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকার বার্তা সম্পাদক নিযুক্ত হন। এবছর আবার তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন অধ্যাদেশ জারি করে চারটি পত্রিকা ছাড়া সব পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৯৭৭ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তা-র নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত করে কামাল লোহানীকে। পরের বছর তাঁকে সম্পাদক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট-এর প্রকাশনা পরিচালক ও ডেপথনিউজ বাংলাদেশ-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কয়েক মাস পরেই তিনি পিআইবি-র এসোসিয়েট এডিটর পদে নিযুক্ত হন। তাঁর অনেক লেখালেখির মধ্যে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে কয়েকটি। বইগুলো হচ্ছে -আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম, আমরা হারবো না, সত্যি কথা বলতে কি, লড়াইয়ের গান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৃত্যশিল্পের বিস্তার, মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার, এদেশ আমার গর্ব, মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার, যেন ভুলে না যাই, রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার, দ্রোহে প্রেমে কবিতার মত এবং কবিতার বই শব্দের বিদ্রোহ। তাঁর আরো কয়েকটি বই প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

সাত.
কামাল লোহানী আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে কখনও আপোষ করেননি। সেকারণে তাঁকে অনেকবার হয়রানির শিকার হতে হয়েছে, চাকরি হারাতে হয়েছে কিংবা অব্যাহতি নিতে হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে দায়িত্ব পেলেন ঢাকা বেতারের। পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিলেন কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পরিবর্তন না হওয়ায় নীরব প্রতিবাদে তিনি বেতার ত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার পরও ১৯৭৫ সালে তিনি বাকশালে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান। আবার ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সফরসঙ্গী নির্বাচিত হওয়ার পরও পাজামা-পাঞ্জাবির বদলে স্যুট-কোট পরতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিদেশে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮১ সালে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সাথে মতবিরোধ হলে দৈনিক বার্তা-র সম্পাদকের পদ ছেড়ে দিয়ে ঢাকা ফিরে আসেন। ১৯৯২ সালে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর সাথে মতবিরোধ হওয়ায় শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের পদ ত্যাগ করে পিআইবিতে ফিরে আসেন। পিআইবির মহাপরিচালক তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠান।

আট.
২০১২ সালে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর জাতীয় সম্মেলনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে কাছে থেকে দেখার ও বুঝার সুযোগ হয়। কথা ও কাজের মিল, সময়মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সময় মেনে চলার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অনুসরণযোগ্য। কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে সভাগুলো নিয়ন্ত্রণ করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তিনি ছিলেন গণতান্ত্রিক এবং দক্ষ। অনেক সময় তাঁর মতামত গৃহীত না হলেও তিনি গণতান্ত্রিক রীতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সেটা শুধু গ্রহণ করতেন না, বরং ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে যথাসাধ্য ভূমিকা পালন করতেন। অপেক্ষাকৃত তরুণ সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতেন। আবার অনেক সময় তাদের তারুণ্যসুলভ উত্তেজনাকেও নিয়ন্ত্রণ করতেন। আমরা যারা ঢাকার বাইরে থেকে সভায় যোগ দিতাম তাদের বক্তব্য ও মতামতকেও গভীর বিবেচনায় নিতেন। সবার প্রতি ছিল তাঁর গভীর মমত্ববোধ ও ভালবাসা।তাঁর নেতৃত্বেই উদীচী সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দক্ষিণ এশীয় সাংস্কৃতিক কনভেনশন সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছিল। সেই কনভেনশনে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন ও জাপানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি উদীচী-র কর্মকা-ে যুক্ত ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম সদস্য হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছেন। যেকোনো সংকটকালে কিংবা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আমরা লোহানী ভাইয়ের অভিজ্ঞতাপ্রসূত পরামর্শ ও মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতাম।

নয়.
অসম সাহসী মানুষ কামাল লোহানী দেশে-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৯১ সালে কলকাতা পুরসভার দ্বিশতবর্ষ সম্মাননা পান তিনি। প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সম্মাননা এবং রাজশাহী লেখক সংঘ সম্মাননা লাভ করেন তিনি। ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর ক্রান্তি স্মারক -২০০৩ ও ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠীর ঋষিজ সম্মাননা ও স্মারক প্রদান করা হয় তাঁকে। বাংলা একাডেমি ফেলো কামাল লোহানী জাহানারা ইমাম পদক পেয়েছেন ২০০৮ সালে। আর ২০১৫ সালে ভূষিত হন একুশে পদকে।

দশ.
কামাল লোহানী ১৯৬০ সালে বিয়ে করেছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী ও আন্দোলনের সাথী তারই চাচাতো বোন সৈয়দা দীপ্তি রাণীকে। তাঁর সংগ্রামী জীবনের নানা সংকটকালে সেই দীপ্তি লোহানীই ছিলেন ভরসার জায়গা আর প্রেরণাদাত্রী। তাঁদের পুত্র সাগর লোহানী, দুই কন্যা বন্যা লোহানী ও ঊর্মি লোহানীও দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সাথে যুক্ত রয়েছেন।

৮৬ বছর পূর্তির পাঁচ দিন আগে কামাল লোহানী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন অজানা ঠিকানায়। দেশ ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা নিয়ে তিনি সারাটা জীবন সমতা আর অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে গেছেন অকুতোভয়ে। সবার উপরে মানুষ সত্যকে তুলে ধরতে তাঁর আজীবন সংগ্রাম আমাদের চেতনাকে শাণিত করবে নিশ্চয়ই। সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবি আর শুভ্র চুলের দীর্ঘদেহী এই লড়াকু বাঙালির আপোষহীন পথচলা আমদের চিরন্তন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। মৃত্যুর পরও স্বল্প সংখ্যক মানুষ বেঁচে থাকেন তাঁদের কর্মে। আমাদের কামাল লোহানী ভাই তাঁদেরই একজন।

লেখক: জহুরুল কাইয়ুম, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ