1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় বিকাল ৪:২০ আজ বৃহস্পতিবার, ২৫শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৯ই জুলাই, ২০২০ ইং, ১৮ই জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী




মু্ক্তি হরণ সরকার:মাঝে মাঝে তব দেখা পাই 

  • সংবাদ সময় : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২০
  • ১১৩ বার দেখা হয়েছে
জহুরুল কাইয়ুমঃ
গত শতাব্দীর সত্তর দশকের একটা সময়ে গাইবান্ধার সাহিত্যকর্মীরা পৌরপার্কের কড়ইতলায় নিয়মিত মাসিক সাহিত্য সভায় বসতেন। আমরা যারা লেখালেখি করার চেষ্টা শুরু করেছি তারা এ সভাগুলােতে যুক্ত হয়ে পড়লাম । সেখানে অনেকের মত মুক্তি দার সাথেও পরিচয় । প্রায় সকলেই নিজেদের লেখা পড়তেন । পরে সেগুলাের উপর আলােচনা করতেন  পুরানাে লিখিয়েরা। আমরা উন্মুখ থাকতাম নতুন লেখা পড়ার জন্য আর চিন্তায় থাকতাম লেখার কি রকম সমালােচনা হয় সেটা নিয়ে । মুকতি হরণ সরকার যেদিন আলােচনা করতেন সেদিন আমরা অনেকটা স্বস্তিতে থাকতাম। কারণ তিনি সদা হাস্যময় ভঙ্গিতে আমাদের ভুলগুলাে ধরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি তাদের লেখালেখি শুরুর সময়কার স্মৃতিচারণ করতেন খুব সাবলীলভাবে । এভাবেই মুকতি হরণ সরকার হয়ে উঠলেন আমাদের মুকতি দা ।
সাহিত্য সভা করতে করতেই এক সময় আমাদের চিন্তায় এলো গাইবান্ধায় বড় আকারের একটি সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠানের । ১৯৮০ সালের ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন হলাে । অধ্যাপক যতীন সরকার , অধ্যাপক আবুল কাশেম চৌধুরী , কবি আল মাহমুদ , নির্মলেন্দু গুণ , আসাদ চৌধুরী , ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া , প্রাবন্ধিক বশীর আল হেলাল প্রমুখের উপস্থিতিতে দুদিনের ঐ সম্মেলন ছিল খুবই জমজমাট । মুকতি দা ছিলেন আয়ােজকদের অন্যতম একজন । সেকি উদ্দীপনা মুক্তি দার। সাহিত্য সম্মেলনের সফল সমাপ্তির পর একটি সংগঠনের ভাবনা এলাে । গঠিত হলাে গাইবান্ধা সাহিত্য পরিষদ । সেখানেও মুকতিদা অগ্রণী।
শহরের অনেকেই যখন এ নিয়ে দ্বিধান্বিত তখনও মুকতি হরণ সরকার উদ্যমী । সাহিত্য পরিষদে এক সময় মতভিন্নতা দেখা দিল , বিভক্তি হলাে। মুকতি দা দুঃখ পেলেন , কিন্তু নীতিগত প্রশ্নে সঠিক অবস্থান নিলেন । দীর্ঘদিনের বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক শীতল হলেও সাংগঠনিকভাবে আপােষ করেননি । ঐ সময় লেখালেখি নিয়ে আরও গভীরভাবে মেতে উঠলেন । গাইবান্ধায় আমরা প্রথমবারের মত দর্শনীর বিনিময়ে কবিতা – ছড়া পাঠের আসর করলাম , গুণীজন সংবর্ধনা হলাে । এসব আয়ােজন সংগঠিত করতে প্রায় প্রতিদিন মুকতি দা লক্ষ্মীপুর থেকে কামারপাড়া হয়ে ট্রেনে গাইবান্ধা আসতেন। দুপুরে ট্রেন সময়মত এলে দুপুরে ফেরা আর না এলে সিঙ্গারা – চা খেয়ে দিন কাটিয়ে দেয়া । ১৯৮৫ সালে গাইবান্ধায় সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী – র কাজ শুরু হলাে । মুকতি দা যুক্ত হলেন উদীচীর কাজে । এক সময় কামাপাড়ায় উদীচীর শাখা সংগঠিত করলেন স্থানীয় তরুণদের নিয়ে । আর তার মাধ্যমেই শুরু হলাে মুকতিদার অন্য এক আন্দোলন । দেশপ্রেমিক – প্রগতিশীল চিন্তার এই মানুষটি গ্রাম বাংলার মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা থেকে শুরু করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি , সামরিক স্বৈরাচার এবং তার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদী আন্দোলনকে তুলে ধরতে লাগলেন গানের ভাষায়। লােকজ ভঙ্গিমায় কি অপূর্ব উপস্থাপনা । বিভিন্ন স্থানে প্রশংসিত হলাে ঐ গানগুলাে । উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে ১৯৯৬ সালে আয়ােজন করেছিল স্কুলের ছাত্র – ছাত্রীদের জন্য স্বাধীনতার ইতিহাস প্রতিযােগিতা ।
মুকতি দার আগ্রহ এবং উৎসাহেব কারণেই সদর উপজেলা কেন্দ্রের অতিরিক্ত লক্ষ্মীপুর হাইস্কুলে একটি কেন্দ্র করে ঐ প্রতিযােগিতার পরীক্ষা নেয়া হয় ।
আদর্শ একটি শিক্ষায়তন গড়ে তােলার স্বপ্ন নিয়ে তিনি কামারপাড়ায় একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেন। ঐ স্কুলে শহিদ মিনার গড়লেন , কৃষ্ণচূড়া লাগালেন , ছাত্রীদের সঞ্চয়ী করে গড়ে তােলার উদ্যোগ নিলেন । সাহিত্য -সাংস্কৃতিক প্রতিযােগিতা, নবীনবরণ অনুষ্ঠান  সবই করতেন ঐ প্রতিষ্ঠানে । অথচ আইনের মারপ্যাচে বিদ্যালয়টির অনুমােদন হলাে না । এ নিয়ে প্রচন্ড মনকষ্টে ভুগতেন মুক্তি দা।
সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে মুকতি হরণ সরকার ছিলেন খুবই সিরিয়াস । ছড়া – পদ্য লেখা নিয়ে তাঁর পরীক্ষা – নিরীক্ষার শেষ ছিল না । নানা ফর্মে তিনি লিখেছেন । এমন মিষ্টি হাত খুব কমই দেখা যায় । নানা সৃষ্টিশীল লেখার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রকৃতি নিয়ে অসংখ্য লিখেছেন । কবিতা গল্পও লিখেছেন প্রচুর । সেগুলােতে দুঃখ যন্ত্রণা ছিল , রােমান্টিকতা ছিল সর্বোপরি একটি জীবনবােধ স্পষ্ট ছিল । মৃত্যুর ২/৩ বছর আগে শুরু করেছিলেন বিখ্যাত কিছু কবিতার ভাবানুবাদ । তাও ছিল চমৎকার , সাবলীল । আমাদের মাতৃভাষার শুদ্ধ চর্চার বিষয়ে অপরিসীম দরদ ছিল মুকতি দার । তিনি লিখেছিলেন ‘বাংলা ব্যাকরণের কয়েকটি বিষয়’ নামের একটি বই।  মুকতি দার পড়াশুনার ক্ষেত্র ব্যাপক বিস্তৃত ছিল । নানা ধরণের বই পড়তেন । আর পছন্দ হলেই আমাদের বলতেন- ‘বইটা পড়ে দেখ।’ সব কি পড়া হয়েছে আমাদের!
মুকতি দা হঠাৎ অসুস্থ হলেন । ছােট খাটো চিকিৎসা করালেন। নিজের কষ্ট চেপে রাখতেন যেমন তেমনি রােগকেও । কিন্তু রােগ কি তা মানে । ভিতরে ভিতরে তার বিস্তার ঘটলাে । ঘনিষ্ঠদের চাপে ঢাকা যেতে রাজি হলেন । গাইবান্ধা ষ্টেশনে এসে আন্তনগরে উঠলেন । সেখানেই দেখা করলাম , কথা হলাে কম । ট্রেন ছেড়ে দেয়ার পর দেখলাম মুকতি দার বড় ভাই কাঁদছেন । আমরা যতটা ভাবিনি, উনি হয়তাে পরিণতি বুঝতে পেরেই কাঁদছিলেন । কয়েকদিন পরই ঢাকা থেকে খবর এলাে দুরারােগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত আমাদের প্রিয় মুকতি দা । ঢাকায় তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরাসহ অনেকেই চেষ্টা করলেন , সহায়তার হাত বাড়ালেন । উন্নত চিকিৎসার চেষ্টাও হলাে । কিন্তু সব ব্যর্থ করে ১৯৯৭ সালের ২২ মে প্রিয় পৃথিবী আর তার অসংখ্য স্বজনকে ছেড়ে চলে গেলেন
মুকতি হরণ সরকার । পরদিন রাতে তাঁর নিথর দেহ ফিরে এলাে তার খুবই প্রিয় লক্ষ্মীপুরের ধনকুঠিতে । ২৪ মে সকালে আমরা অনেকেই গেলাম সেখানে । অঝােরে বৃষ্টি পড়ছিল । মনে হচ্ছিল প্রকৃতিও যেন কাঁদছে তার এক প্রিয় সন্তান হারানাের বেদনায় ।
মুক্তি দা চলে যাওয়ার ২৩ বছর পেরিয়ে গেল । এখনও ভাবি তাঁর মত দেশপ্রেমিক , নির্লোভ , নিরহংকার , প্রগতিশীল , অসাম্প্রদায়িক মানুষ কেন অকালে চলে গেলেন । চলে যাওয়ার সময় তাে তার হয়নি । তাকে আরও অনেকদিন প্রয়ােজন ছিল আমাদের । মুকতি দার স্মরণে এই লেখাটি শেষ করছি মুকতি দার ‘ যাওয়া মানেই তাে যাওয়া নয় ’ শীর্ষক কবিতাটির শেষাংশ দিয়ে – ‘ আমার তাে মরণ নেই শত যােজন দূরে / যে নক্ষত্র আছে , তার মত আমার দেহও / একই কার্বন দিয়ে তৈরি , আমিও/ তাে অবিনশ্বর । তাই যাওয়া মানে তাে যাওয়া নয় , যাওয়া মানে তাে / ফিরে ফিরে আসা । ‘
মুকতি দা তাঁর লেখালেখি আর কাজের মাধ্যমেই ফিরে ফিরে আসেন আমাদের মাঝে।
লেখকঃ জহুরুল কাইয়ুম, সাংবাদিক. শিক্ষক, সংস্কৃতিক সংগঠক। 




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ