1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় দুপুর ১:৩৬ আজ বুধবার, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৬ই জিলহজ, ১৪৪২ হিজরি




বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রামে চিরবন্ধু রবীন্দ্রনাথ

  • সংবাদ সময় : মঙ্গলবার, ৮ মে, ২০১৮
  • ১৪৩৯ বার দেখা হয়েছে

জহুরুল কাইয়ুম:
বাঙালির আত্মপরিচয় বিকাশের স্বাভাবিক অগ্রযাত্রা নানা সময়ে বাধাগ্রস্থ হয়েছে। কখনও তার ভাষা-সংস্কৃতি আক্রান্ত হয়েছে, কখনও সাম্প্রদায়িকতা,ধর্মান্ধতা বাঙালি সমাজকে বিপর্যস্ত করেছে আবার কখনও তার স্বাধিকার আন্দোলনকে অস্ত্রের শক্তিতে ঠেকিয়ে রাখার অপচেষ্টা হয়েছে। বাঙালি যখনই তার আত্মপরিচয় নিয়ে সংকটে পড়েছে তখনই বাঙালির সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন বাংলা ভাষা সাহিত্যের প্রধান পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম,সঙ্গীত বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রামে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে পড়েছে। শতাধিক বছর ধরে বাঙালির সুখে-দুখে,আনন্দ-বেদনায়,আন্দোলন-সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির নির্ভরতার অন্যতম স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
সাতচল্লিশে দেশভাগের পর আটচল্লিশেই বাঙালির ভাষার উপর আঘাত এলো। আর তার প্রতিরোধে বায়ান্নতে বাঙালির রক্ত ঝরলো। বাঙালি ঘুরে দাঁড়ালো তার ভাষা সংস্কৃতির জন্য,অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। সে সময়ই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়েছিল-‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ কিংবা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। রবীন্দ্রনাথের এ গানগুলোর প্রাণস্পর্শী বাণী এবং সুরময় আবেগ বাঙালিকে আন্দোলিত করেছিল। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আপন ভাষা-সংস্কৃতি অভিমুখে বাঙালি যে অভিযাত্রার সূচনা করেছিল রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন তাকে আরও শাণিত করে তুলেছিল। পাকিস্তানি শাসকরা রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনে বাধা দেয়ার অপপ্রয়াস পেল এমনকি রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ বা খন্ডিত করার অপচেষ্টাও করলো। কিন্তু তার কোনটাই সফল হয়নি। বরং বাঙালির সংস্কৃতির সংগ্রাম বেগবান হয়েছে,বাঙালি বোধের সঞ্চালন ঘটেছে ঐ রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই। বাঙালির পাশে একে একে দাঁড়িয়েছেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়,অতুল প্রসাদ সেন,রজনীকান্ত সেন এবং কাজী নজরুল ইসলাম।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাজনীতিক ছিলেন না। কিন্তু রাজনীতি সচেতন ছিলেন বলেই সকল প্রকার অন্ধত্ব,কূপমন্ডূকতার বিরুদ্ধে মানবমুক্তির আদর্শ উচ্চকিত ছিল তাঁর সকল শিল্প সাহিত্য কর্মে। সেকারণে তিনি নিপীড়িত,বঞ্চিত বাঙালির আনন্দ-বেদনা,লড়াই-সংগ্রামে নিরন্তর প্রেরণা যুগিয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর কবিতা ও গান বারবার বাঙালিকে আত্মপরিচয়ের গৌরববোধে দীপ্ত করেছে। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশপর্বের অধিকাংশ গান অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে,উদ্দীপ্ত করেছে। আবার অনেকগুলো কবিতা ধর্মান্ধতা,অমানবিকতা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমাদের জাগ্রত করেছে।
রবীন্দ্রনাথের গানের সাথে বাঙালি ও বাংলাদেশের আত্মিক সম্পর্ক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেই অত্যন্ত আশাবাদী ছিলেন। তাই তিনি লিখেছিলেন‘ বাংলাদেশকে আমার গান গাওয়াবই। আমি সব যোগান দিয়ে এলুম, ফাঁক নেই। এ না গেয়ে উপায় কী ? আমার গান গাইতেই হবে সবকিছুতে। তাই গান সম্পর্কে আমার অহংকারের বিষয় আছে।’ রবীন্দ্রনাথের পূজা,প্রকৃতি,প্রার্থনা,প্রেম,বিচিত্র পর্বের অসংখ্য গান বাঙালির স্বকীয় আদল বিনির্মাণে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে। আর আন্দোলন-সংগ্রাম,মুক্তির লড়াইয়ে তার স্বদেশ পর্বের গানগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। এই গানগুলোর রচনাকাল ১৯০০-১৯২০ খৃষ্টাব্দ। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই স্বদেশ পর্বের অধিকাংশ গান রচিত।  গানগুলোর মধ্যে বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যকে যেমন তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ তেমনি প্রতিবাদী হতে সাহসী করেছেন,দেশপ্রেমে উদ্বেলিত করেছেন,উদ্দীপনা যুগিয়েছেন। স্বদেশ পর্বের ৪৬ টি গানের মধ্যে ৩৬ টি গান আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অসংখ্যবার গীত হয়েছে। আমাদের মুক্তিসেনানীদের লড়াইয়ের মাঠে অসমসাহসী হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বাংলার অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর দেশপ্রেমে একাকার অনেক গান আমাদের হৃদয়কে আবেগতাড়িত করে ভালোবাসায় উদ্বেলিত করে,সহসাই চোখে জল এসে যায়। সেগুলোর প্রথম পংক্তি দেখলেই স্পষ্ট হবে আমাদের অনুভবের কথা-‘আমার সোনার বাংলা,আমি তোমায় ভালোবাসি’, ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’,‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’,‘বাংলার মাটি বাংলার জল’,‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’,‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়–ক/আমি তোমায় ছাড়ব না মা’,‘জানিনে তোর ধন রতন আছে কিনা রাণীর মতন’। উদ্দীপনামূলক গানগুলোর মধ্যে রয়েছে-‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’,‘এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে’,‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’,‘নাই নাই ভয়/হবে হবে জয়’,‘আগে চলো আগে চলো ভাই’,‘শুভ কর্ম পথে ধর নির্ভয় গান’। আবার অসমসাহসী হয়ে প্রতিবাদী হতে উদ্বুদ্ধ করেছে কিছু গান। সেগুলো শুনলেই আমরা উদ্দীপ্ত হই,আন্দোলিত হই,যুথবদ্ধ হয়ে সংগ্রামে নামি। এরকম কয়েকটি গানের প্রথম পংক্তি-‘তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে/তা বলে ভাবনা করা চলবে না’,‘আমি ভয় করব না,ভয় করব না’,‘আপনি অবশ হলি তবে বল দিবি তুই কারে’,‘এখন আর দেরী নয় ধর গো তোরা’,‘বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখি/বারে বারে হেলিস্নে ভাই’,‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে’,‘ওদের বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান/তুমি কি এমনি শক্তিমান’। রবীন্দ্রনাথের এরকম গানগুলোই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছে,সংগ্রামী শিল্পীরা গেয়ে বেড়িয়েছেন মুক্ত এলাকায়,মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। উদ্দীপ্ত হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ দেশপ্রেমিক মানুষ।
রবীন্দ্রনাথের জন্মের সার্ধশত বৎসর পেরিয়ে গেলেও আজও আমাদের জন্য রবীন্দ্রনাথ সমান প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয়। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে  আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িকতা,ধর্মান্ধতা এবং বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী যে চেতনার বিস্তার ঘটেছে তার  বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আমাদের রবীন্দ্রনাথেই আশ্রয় খুঁজতে হবে। রবীন্দ্রনাথ শত বৎসর আগে যে লেখা লিখেছিলেন তা অনুধাবন করেই আমাদের চেতনা শাণিত করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ব্যাধি ও প্রতিকার নামক প্রবন্ধে লিখেছেন-‘হিন্দু মুসলমান সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশে একটা পাপ আছে। ……আমরা বহুশত বৎসর পাশে পাশে থাকিয়া এক ক্ষেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিতেছি, আমরা এক ভাষায় কথা কই, আমরা একই সুখ দুঃখে মানুষ-তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত ধর্ম্ম-বিহিত তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই।’ মানুষে মানুষে বৈষম্যের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ উচ্চকিত হয়েছেন গীতাঞ্জলির কবিতায়-‘মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে/ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে/বিধাতার রুদ্ররোষে দুর্ভিক্ষের দ্বারে বসে/ভাগ করে, খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান।/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান’। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ খুব দৃঢ় উচ্চারণ করেছেন তাঁর ‘ধর্মমোহ’ কবিতায়। লিখেছেন-‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।/নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর/ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।/ শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো,/ ‘শাস্ত্রে মানে না, মানে মানুষের ভালো’। একই কবিতার শেষে তিনি অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেবার উদাত্ত আহŸান জানালেন এভাবে-‘হে ধর্মরাজ, ধর্মবিকার নাশি/ধর্মমূঢ়জনেরে বাঁচাও আসি।/যে পূজার  বেদি রক্তে গিয়েছে ভেসে/ ভাঙো ভাঙো, আজি ভাঙো তারে নিঃশেষে-/ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,/এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো’।
লেখক: জহুরুল কাইয়ুমঃ  কলেজ শিক্ষক, সংস্কৃতি কর্মী ও সাংবাদিক।




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ