1. aftabguk@gmail.com : aftab :
  2. ashik@ajkerjanagan.net : Ashikur Rahman : Ashikur Rahman
  3. chairman@rbsoftbd.com : belal :
  4. ceo@solarzonebd.com : Belal Hossain : Belal Hossain
×
     

এখন সময় দুপুর ২:১৫ আজ রবিবার, ২৬শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৯ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২৫শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি




রোহিঙ্গা সংকটের ব্যাপ্তি ও সমাধান- মোস্তাফা জব্বার, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ

  • সংবাদ সময় : রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭
  • ২৩২ বার দেখা হয়েছে

এক.
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের সর্বশেষটির সূচনা থেকে দেড় মাসের বেশি সময় পার হওয়ার পর আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে যে, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি মানবিক প্রসঙ্গ কিন্তু মিয়ানমার বা আমাদের প্রতিবেশীসহ বিশ্বের তাবৎ পরাশক্তি এমনকি মুসলিম আরব বিশ্বের জন্যও একটি মহাবাণিজ্য। অনেকে বলেন, রাখাইন রাজ্যের অবস্থা গরিবের ঘরের সুন্দরী স্ত্রীর মতো। সে ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’। তার মাংসের লোভে মানবতার ঠিকাদাররাও এখন চুপ হয়ে বসে আছে। মিয়ানমার হোক আর চীন, ভারত, রাশিয়া কিংবা সৌদি আরব বা আমেরিকা হোক এই সুন্দরী বৌ তাদের চাই-ই। ভারতের সরকারি মুখপাত্ররা এতদিনে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে যেসব মন্তব্য করেছেন তারপর ভারতকে নিয়ে বাংলাদেশের আর কোনো আশাবাদের প্রত্যাশা থাকা সমীচীন নয় বলেই আমার মনে হয়।

তবে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে এই দেশের জনগণ ও সরকারের অঙ্গীকার অন্যরকম। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রত্যয়ের সঙ্গে এটি বলেছেন যে, এক বেলা না খেয়ে থাকলেও রোহিঙ্গারা না খেয়ে থাকবে না। এই অঙ্গীকারের জন্য তাকে মানবতার কন্যা বলাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যরা? বিশ্ব মুরব্বিরা? পুঁজিবাদের মোড়ল বা সমাজতন্ত্রের মাতবর কেউই এটাকে তাদের নিজেদের স্বার্থের ব্যবসা ছাড়া আর কিছু ভাবছে না। বিশ্ব সংস্থা নিরাপত্তা পরিষদ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া সভা বারবার শেষ করেছে। এমনকি ইসলামের ধ্বজাধারীরাও রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর পরিচালিত গণহত্যা নিয়ে টুঁ শব্দও করেনি। আমাদের দেশের ধর্মব্যবসায়ীরাও চুপ। টাকার কাছে ধর্মও চুপ হয়ে গেছে। তবে দায় পড়েছে সেই দেশটির ওপর যে দেশটি রক্ত দিয়ে নিজে মুক্ত হয়েছে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে এবং বিশ্বের সব নির্যাতিত মানুষের পক্ষে চিরকালই রয়েছে। আমরা বাঙালিরা সে জন্য গর্ববোধ করি। আমরা ১৬ কোটি মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই অঙ্গীকারকে অন্তরে ধারণ করি যখন তিনি বলেন, ১৬ কোটি মানুষ বাংলাদেশে বাঁচতে পারলে আরো দশ-বিশ লাখ রোহিঙ্গাও বাঁচতে পারবে। আমরা ভাগাভাগি করেই খাব-বেঁচেও থাকব।

আমার নিজের কাছে যেটি বিস্ময়কর মনে হয়েছে সেটি হলো বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে প্রতিটি রোহিঙ্গার জন্য একবার হলেও চোখের পানি ফেলেছে। তারা নিজেদের একাত্তরের অবস্থার সঙ্গে তাদের অবস্থাকে মিলিয়ে দেখেছে এবং নিজের অতি আপনজন মনে করেছে। অভিনন্দন বাঙালি।

মিয়ানমারের সাড়া: অবশেষে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে মিয়ানমারের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে খবর পেলাম আমরা। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু কির দপ্তরের মন্ত্রী কিউ টিন্ট সোয়ে একদিনের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশের পররষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে এমন একটি সমঝোতার কথা বলা হয়েছে। সমঝোতায় কী থাকবে এবং কবে কেমন করে কোন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা হবে সেসব বিষয় এখনো জানা যায়নি। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের এই আলোচনাকে বাহ্যত ইতিবাচকভাবেই দেখা যেতে পারে। খবরটির ভালো দিক হচ্ছে যে, মিয়ানমার এই প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রæপ গঠন করতে সম্মত হয়েছে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমারকে একটি চুক্তির খসড়া দেয়া হয়েছে বলেও জানান। তিনি আরো জানান যে, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সহসাই মিয়ানমার সফর করবেন। বাংলাদেশ সন্ত্রাস বিষয়ে জিরো টলারেন্সের কথা জানিয়েছে বলেও খবরে জানা গেছে। বৈঠকে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে সেই বৈঠকের ফলোআপ কিন্তু এখনো হয়নি। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অচিরেই মিয়ানমার সফর করবেন।
১৩ অক্টোবর ২০১৭ মিয়ানমারের নেত্রী অং সু কির যে ভাষণ আমি টিভিতে দেখেছি ও শুনেছি তাতে একটু আশাবাদ জন্ম নিতে পারে। সু কি নিজে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে সেখানে তাদের পুনর্বাসন করার পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যের উন্নয়নের কথা বলেছেন। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার ঘোষণাও প্রদান করেন। তার তিন দফার বিস্তারিত জানা না গেলেও তার ভাষণটি অন্তত এই প্রসঙ্গে আশাবাদের জন্ম দিতেই পারে।

রোহিঙ্গা প্রশ্নে অনেক খারাপ খবরের মাঝে এটি সম্ভবত টানেলের শেষ প্রান্তে ছোট আলোর রেখার মতো একটি বিষয়। আগে থেকে এই দেশে বসবাস করা রোহিঙ্গারা ছাড়াও কেবলমাত্র এবারেই যে পাঁচ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তাদের বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষ দুনিয়াতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মতো মানবিক অনুভ‚তি প্রকাশ করার পরও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে থেকে এর আর্থসামাজিক অবস্থার যে অবনতি ঘটাবে এবং আমরা যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করব তার কথা ভুলে থাকা যাবে না। রোহিঙ্গারা এতটাই অনগ্রসর যে কলেরা-বসন্ত-পোলিও নির্মূলে বাংলাদেশের সফলতার সঙ্গেও সেই জনগোষ্ঠীর মিল নেই। ফলে এসব মুক্ত একটি দেশে নতুন করে অনিরাপদ একটি জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে প্রবেশ করার ফলে আমাদের জনস্বাস্থ্য বিঘ্নিত হতে পারে।

বিশ্বের অন্যতম জনবহুল একটি দেশ এবার যখন এমনকি খাদ্য সংকটে নিপতিত (মিয়ানমার থেকে খাদ্য আমদানি করতে হয়েছে) সেই দেশের মানুষ তাদের নিজের দেশের বন্যাকবলিত মানুষদের পাশে বসিয়ে রেখে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো একটি অবিস্মরণীয় উদ্যোগ। কিছু লোক রোহিঙ্গাদের মুসলমান বলে আখ্যায়িত করে একটি সাম্প্রদায়িক চরিত্র দেয়ার চেষ্টা করলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে এটি হচ্ছে মানবতার ডাকে সাড়া দেয়া। নিজের খাবারের ভাগ রোহিঙ্গাকে দেয়া। সেই রোহিঙ্গাদের আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে, ধর্ষণ করে, বিতাড়িত করে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে তাদের সম্পত্তি দখল করে আবার বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসার রহস্যটা আমাদের মাথায় রাখতেই হবে। যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয় তাদের সেই দেশটি কী হিসেবে আবার তাদের দেশে ফেরত নেবে সেটিও দেখার বিষয়। যদিও মিয়ানমার অতীতে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়েছে তথাপি রোহিঙ্গাদের এই স্মৃতি আছে যে, দেশে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের সব অধিকার কেড়ে নিয়ে গণহত্যা চালিয়ে যাওয়া হয়। তাদের মনে প্রশ্ন থাকবেই যে, এখন কেন আবার ওদের প্রত্যাবাসনের প্রসঙ্গ আসছে? রাখাইনে ফিরে গিয়ে একই ভয়ঙ্কর অবস্থায় তারা পড়বে নাম তেমনটির ভরসা কী?

আমার নিজের কাছে এটিও রহস্যজনক মনে হয় যে, কেন নিরাপত্তা পরিষদ রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারেনি। রোহিঙ্গাদের কথাই বা কেন বলিÑ একাত্তরে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘ মানবতার পক্ষে জোরালো ভ‚মিকা নিতে পারেনি। এবার আন্তর্জাতিক চিত্রটা বেশ বৈচিত্র্যময়। আমেরিকা-চীন-রাশিয়া ও আরব বিশ্ব মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পাশে থাকার পাশাপাশি ভারতও তাতে যোগ দিয়েছে। আমাদের সময়ে ভারত, রাশিয়া পক্ষে থাকলেও এবার ভারতের ও রাশিয়ার বাণিজ্য স্বার্থ আছে মিয়ানমারের রাখাইনে। তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবাধিকারের চাইতে নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখার দিকে মনোযোগী হয়ে আছে।

এমনটি মনে করার কারণ আছে যে, মিয়ানমারের মুরব্বিরা এটি অনুভব করেছে যে, সারা দুনিয়ার সাধারণ মানুষ তাদের থুতু দিচ্ছে এবং তারাই মিয়ানমারকে বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করার বুদ্ধি দিয়েছে। মিয়ানমার সরকারের সেই নাটকটির প্রথম দৃশ্য আমরা দেখলাম মাত্র। জানি না সামনে আর কোন কোন দৃশ্য রয়েছেÑ আর কী কী নাটক মিয়ানমার ও তার মুরব্বিরা মঞ্চস্থ করবে।

আমি নিজে মনে করি মিয়ানমার নিজেই কিছু সাজানো নাটক করবে। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চালাবে, নরম সুরে কথা বলবে এবং পাশাপাশি রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়নও অব্যাহত রাখবে। তারা আলাপ-আলোচনা করবে এবং তাদের মুরব্বিরাও মাঝে মাঝে সহানুভ‚তির কথা বলবে। মিয়ানমার জানে যে, তারা অন্যায় করছে এবং অন্তত কফি আনান কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলো না মানা দুনিয়াবাসীর কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু তাদের দশা ‘মুখ মে শেখ ফরিদ আওর বগল মে ইট’। এই অবস্থা যতটা সম্ভব তারা চালিয়ে যাবে।

এতদিনে আমরা জানতে পেরেছি যে, বাংলাদেশের সঙ্গে একটা যুদ্ধ বাঁধানো তাদের ইচ্ছা ছিল। তাদের দ্বারা বাংলাদেশ সীমান্ত লঙ্ঘন করাও তারই প্রধান বিষয় ছিল। বাংলাদেশ সেই ফাঁদে পা দেয়নি। যদিও আমি নিজে মনে করি মিয়ানমার যুদ্ধে জড়িয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে জয়ী হতে পারত তেমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে এখন বাংলাদেশের যুদ্ধে জড়ানো মানে তার অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়া, যেটি আমরা এখন করতেই পারি না।

অবশ্য রোহিঙ্গা সংকটের এটিও একটি সমাধান যে, রাখাইন রাজ্যটি দখল করে সেখানে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন ও নিরাপত্তার বিধান করা। ভারত শরণার্থীদের চাপে পড়ে একাত্তর সালে যেভাবে যুদ্ধে জড়িয়েছিল বাংলাদেশ তেমন দশায় পড়তেও পারে। তবে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে তার দুই প্রতিবেশী ভারত ও চীনকে নিয়ে আগে ভাবতে হবে এবং এবারের মতো বিচক্ষণতার সঙ্গে সংকট কাটানোর চেষ্টা করতে হবে। এর চাইতেও জরুরি বিষয় হচ্ছে যে, রোহিঙ্গারা নিজেরা কতটা প্রস্তুত। ভারত যখন বাংলাদেশকে নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায় তখন বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী দেশটি স্বাধীন করার সব যোগ্যতাই অর্জন করেছে। বাংলাদেশের জনগণও সেই সচেতনতা ও জাতীয়তাবোধ গড়ে তুলেছিল যা রোহিঙ্গাদের নেই।

দুই.
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান : রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকেই করতে হবে সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। বাংলাদেশ তাদের বিপদের আশ্রয় হলেও এই দেশ তাদের জন্য রাখাইন রাজ্য দখল করে সেখানে বসবাস করার মতো অবস্থা তৈরি করে দেবে তেমনটি ভাবার আগে এই জনগোষ্ঠীকে নিজেদের বিষয়ে ভাবতে হবে। বাংলাদেশের জন্মের সময় ভারত আমাদের পাশে ছিল। কিন্তু লড়াইটা আমরা বাংলাদেশের মানুষই করেছি। রোহিঙ্গাদের লড়াইটাও তাদেরই, আমাদের নয়।

১) এটি সারা দুনিয়ার উপলব্ধি করা উচিত যে, রোহিঙ্গারা একটি জাতিগোষ্ঠী। তারা মিয়ানমারের রাখাইনে বসবাস করলেও মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের কোনো মিল নেই। তারা অনগ্রসর-দরিদ্র ও অশিক্ষিত। রাখাইন রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভৌগোলিক অবস্থান তাদের জন্য কোনো সুবিধা না দিয়ে বাড়তি সংকট তৈরি করেছে। মিয়ানমার সরকার গোড়া থেকেই এই জনগোষ্ঠীকে কেবল বৈষম্যের চোখে দেখেনিÑ তারা তাদের নিশ্চিহ্ন করার সব দুরাচারই করেছে। এটি যুগ যুগ ধরে করার ফলে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারকে তাদের নিজেদের দেশও ভাবতে পারেনি। ফলে সেই দেশের সরকারকেও তারা নিজের বলে ভাবেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তারা মিয়ানমারের মূল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে ব্রিটেনের পক্ষে এবং ১৯৪৭ সালে তারা পাকিস্তানের দিকে তাকিয়েছিল। এরপর তারা মুসলিম সহানুভ‚তি পাওয়ার প্রচেষ্টা করেছিল। বাস্তবে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের সাংস্কৃতিক মিল থাকায় এই অঞ্চলটিকে তাদের আশ্রয়ের জায়গা হিসেবে বেছে নেয়। পাকিস্তানে বাঙালি ও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অবস্থার অনেক মিল আছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের দুর্ভাগ্য যে তারা কোনোদিন একটি সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব পায়নি। মিয়ানমারের স্বাধীনতার সময়ে যেসব রোহিঙ্গা জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অধিকার, বঞ্চনা, নির্যাতন, স্বায়ত্তশাসন বা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেই পারেননি। ওদের কোনো ছাত্র বাহিনী ছিল না বা একজন বঙ্গবন্ধু নেই। ফলে বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাণিজ্যই হচ্ছে। তাদের দারিদ্র্য-অশিক্ষা ও অনগ্রসরতা সৌদি আরব-পাকিস্তান ও অন্যান্য মুসলিম দেশে বেসাতির হাতিয়ার হয়েছে। রাখাইন রাজ্য ভারত-চীন-রাশিয়ার জন্য নানা ব্যবসার সূচনাও করেছে। একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার গণআন্দোলন গড়ে তোলার বদলে তারা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সেই কর্মকাÐকে মদদ দিতে গিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি স্থাপনে সহায়তা করেছেন। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো জিয়া ও এরশাদের আমলে বাংলাদেশের ভেতরে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র বাহিনীর ঘাঁটি ছিল। সেই সব ঘাঁটিতে রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশের জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। আরব দেশগুলো থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য চাঁদা তুলে সেই চাঁদায় কেউ কেউ ধনী হয়েছে আর সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠেছে। দুঃখজনক হলো বাংলাদেশের মাটিতে প্রশিক্ষণ পাওয়া সেই জঙ্গিরা বাংলাদেশের বিরুদ্ধেই সন্ত্রাসও করেছে। আমি খুবই স্পষ্টভাবে একটি কথা বলতে চাই যে, কোনো জাতিই কেবলমাত্র সন্ত্রাস করে তার নিজের অধিকার আদায় করতে পারেনি। আমরা যদি বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের অবস্থা একটু ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখি তবে অবাক হতে হবে এটি ভেবে যে, এমন মানবগোষ্ঠী এখনো দুনিয়াতে আছে। এটি বিস্ময়কর। এদের জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত করা হয়নি বা তারা নিজেরাই আসলে জানে না যে তাদের ভবিষ্যৎ কী হওয়া উচিত? ওরা বাংলাদেশের এক অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মিল আছে বলে কি বাংলাদেশকে তাদের আবাসভ‚মি মনে করবে, নাকি তারা রাখাইনকে তারা নিজেদের দেশ বলে ভাববেÑ সেটি ওরা জানে বলে আমার মনে হয় না। মিয়ানমারের মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী সেটিও তারা কখনো ভেবেছে বলে মনে হয় না। তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে বলে জানি না। এদের কেউ কেউ এমনকি রাখাইনের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু অংশকে যুক্ত করে আরাকান রাজ্য স্থাপনের দুঃস্বপ্নও দেখে।

আমার নিজের মতে, রোহিঙ্গাদের সংকটের রাজনৈতিক সমাধান একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা। সেই আন্দোলন সৌদি আরব বা পাকিস্তান থেকে জন্ম নেবে না। সিআইএ, কেজিবি বা আইএসআই এই আন্দোলন তৈরি করতে পারবে না। রাখাইনের মাটিতে জন্ম নিতে হবে সেই রাজনৈতিক আন্দোলনকে। রোহিঙ্গাদের সংকটের প্রধানতম কারণ হচ্ছে তাদের দারিদ্র্য ও শিক্ষার অভাব। যুগের পর যুগে তাই রাখাইনে রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব ঘটেনি। আমি নিজে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের নেতা জাফরের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি যে, তারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কী তা জানেই না। তাদের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি ছিল রাখাইনের জাতিসত্তাকে সাম্প্রদায়িক চরিত্র প্রদান করা। এখনো যারা এটিকে রোহিঙ্গা মুসলিম সমস্যা মনে করেন তারা সেই চক্করেই রয়ে গেছেন। মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিপক্ষে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক আন্দোলনে সেখানকার অন্য সংখ্যালঘিষ্ঠদের সম্পৃক্ততাও থাকতে হবে। তথাকথিত মুসলিম জাতীয়তা ওখানে জিততে পারবে না।

সবার আগে রাখাইন রাজ্যের সব মানুষের একটি জাতিয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যার চরিত্র হবে গণতান্ত্রিক। রাখাইনের সেই আন্দোলন মিয়ানমার সরকারকে পরাস্ত করতে সক্ষম হতে পারে। এমনও হতে পারে যেকোনো এক সময়ে সেটি সশস্ত্রও হতে পারে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা হলোÑ সশস্ত্র আন্দোলন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ছাড়া সমাধানের পথে যায় না। তবে একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এতটাই পশ্চাৎপদ যে তাদের নেতৃত্ব দেয়ার মতো মানুষ রোহিঙ্গাদের মাঝে পাওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য রোহিঙ্গাদের শিক্ষা প্রদান করা দরকার। তাদের আর্থসামাজিক অগ্রগতির জন্যও শিক্ষা দেয়া দরকার। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে আসা মানুষদের শিক্ষা দেবে, স্বাস্থ্যসেবা দেবে এবং দারিদ্র্য থেকে বের হওয়ার পথ দেখিয়ে দেবে আপাতত এমনটাই ভাবতে হচ্ছে। তখনই কেবল রোহিঙ্গারা তাদের নিজেদের অধিকার আদায়ে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে।

এই সময়ে মিয়ানমার আরো যেসব নাটক করবে সেসব বাংলাদেশকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে ও রোহিঙ্গাদের আরো অধঃপতন প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশকে কেবল মানবিক দিকটা বিবেচনা করে তাদের পেটে ভাত দেয়ার কথা ভাবলেই হবে না বরং এই জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল যুগের বাসিন্দা করার ব্যবস্থাও হয়তো বাংলাদেশকেই করতে হবে।

২) মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে তাদের গ্রহণ করা অস্ত্রটাকেই ব্যবহার করতে হবে। ওরা কফি আনান কমিশন গ্রহণ করেছে। সারা দুনিয়াকে কফি আনান কমিশন মেনে চলার জন্য এবং সেই কমিশনের সব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, অন্তত কফি আনান কমিশন বাস্তবায়ন ছাড়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পাঠানো না সম্ভব হবে না বরং আরো নতুন গণহত্যার জন্ম দেবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে ‘সেফ জোনে’র প্রস্তাব দিয়েছেন সেটি বাস্তবায়ন না করে রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠালে কি আবারো আগুনের মুখে ঠেলে দেয়া হবে না?

৩) বাংলাদেশের দায়িত্ব হবে রাখাইন রাজ্যকে গ্রাস করার জন্য সা¤্রাজ্যবাদীরা যে ষড়যন্ত্র করেছে তা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা। বিশ্ব জনমত তখন রোহিঙ্গাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতি কেবল সহানুভ‚তিশীল হবে না বরং সমর্থন করবে।

আমি আশা করব রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে কেবল বাইরে থেকে আলোচনার বিষয় হিসেবে না দেখে এর গভীরতায় গিয়ে দেখা হবে।




সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরো সংবাদ