এখন সময় সকাল ৭:৪৫ আজ বৃহস্পতিবার, ৯ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ২৪শে সফর, ১৪৪১ হিজরী


Home / জাতীয় / ‘দেখ, শিবির কীভাবে পেটাতে হয়’ বলেই আবরারকে বেধড়ক পেটান অনিক

‘দেখ, শিবির কীভাবে পেটাতে হয়’ বলেই আবরারকে বেধড়ক পেটান অনিক

ডেস্ক রিপোর্ট: বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা ঘটনায় অনিক সরকারকে গ্রেফতারে আগ পর্যন্ত কিছুই জানতেন না তার বাবা-মা।  এমন বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে ছেলের জড়িত থাকার বিষয়টি জানার পর হতবাক হয়েছেন তারা। জানা গেছে, রাজনীতিতে প্রবেশের পর ছেলের এমন অধঃপতনের বিষয়েও কিছুই ধারণা ছিল তাদের। নিরপরাধ মেধাবী আবরার ফাহাদকে সবচেয়ে বেশি পিটিয়েছে তাদের ছেলে অনিকই।

 গত ৬ অক্টোবর (রোববার) রাত ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ফাহাদের ওপর চলে অমানসিক নির্যাতন। এতে ছাত্রলীগের সকাল, মনির, তানভীর, জেমি, তামিম, সাদাত, রাফিদ, তোহা, অনিকসহ ছাত্রলীগের ১৯ নেতাকর্মী অংশ নেয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারধর করেছে মদ্যপ অনিক।

সেদিন বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে প্রথম দফা পেটানোর পর অনিক সরকারই বলেন, শিবির কীভাবে পেটাতে হয় তা আমার থেকে শিখে নে। এ কথা বলেই, স্ট্যাম্প হাতে তুলে নিয়ে ফাহাদকে বেধড়ক পেটায় অনিক। অনিক সে সময় মদ্যপ ছিলেন। তার প্রমাণও মিলেছে।

গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশের পর একেবারেই মুষড়ে পড়েন অনিকের বাবা আনোয়ার হোসেন।

সাক্ষাৎকারে আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘আমরা জানি অনিক সেখানে পড়ালেখা করছে। যখন জানতে পারি এক ছাত্রকে খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে তাকে আটক করেছে পুলিশ, তখন অবাক হয়ে যাই। ভাবতে পারছি নানা আমার ছেলে কাউকে খুন করতে পারে।’

‘ অনিক অপরাধী হলে প্রচলিত আইনে তার বিচার হোক। এক ফুলে ১০টা কুঁড়ি হলে ১০টাই ফল হয় না।’ বুকভরা কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলেন অনিকের বাবা।

জানা গেছে, অনিক সরকারের বাড়ি রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার বড়ইকুড়ি গ্রামে। অনিক ঐ গ্রামের বাসিন্দা ও কাপড় ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনের ছেলে। তাদের গ্রামের বাড়ি উপজেলার কৃষ্ণপুরে হলেও ব্যবসায়িক কাজে পুরো পরিবার মোহনপুর উপজেলা সদরের বড়ইকুড়ি গ্রামে বসবাস করেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে অনিক ছোট। এছাড়া তাদের পেট্রোল পাম্প এবং সারের ডিলারশীপের ব্যবসা রয়েছে।

ছোটো ছেলে অনিক সরকারই বেশি মেধাবী। তাই তাকে নিয়েই পরিবার বড়ো স্বপ্ন বুনছিলেন। ছেলের পড়াশুনায় যেন কোনো ত্রুটি না হয় সেলক্ষ্যে নিয়মিত টাকা পাঠাতেন অনিককে। আর সেই স্বপ্নই ধুলিসাৎ করে দিল অনিক।

আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এই ছেলেকে নিয়েই আমার যত আশা-ভরসা ছিল। আজ সব মাটি হতে চলেছে। আমি ভাবতেও পারি না এমন মেধাবী একটা ছেলে আরেকজন মেধাবীকে হত্যা করবে। তার তো কোনো অভাব ছিল না। আমি তাকে কোনো অভাব বুঝতে দেইনি। নিয়মিত টাকা পাঠিয়েছি ঢাকায়।

বুয়েটে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে ছেলে এমন নৃশংস হয়েছেন দাবি করে অনিকের বাবা বলেন, কিন্তু কেন সে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ল? আবার কেনই বা আরেকজনকে হত্যা করতে গেল? হয়তো সঙ্গদোষে এমন কাণ্ডে জড়িত হতে পারে। কাজেই ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত করে আমি বিচার করার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

অনিক পড়াশুনা রেখে ছাত্ররাজনীতিতে মনযোগী হয়ে গেছে এ বিষয়ে কিছু জানতেন কিনা এমন প্রশ্নে আনোয়ার হোসেন বলেন, বুয়েটে অনিক কোন সাবজেক্টে পড়ে তা আমি ভালো করে বলতে পারব না। তবে সব সময়ই এই নির্দেশনা দিয়ে রাখতাম, পড়ালেখা ছেড়ে অন্যকিছুতে যেন মনযোগ না দেয়। বিশেষ করে রাজনীতি করা যাবে না। তবে মাস দুয়েক আগে জানতে পারি, ছেলে ক্যাপ্টেন হয়েছে। কিন্তু কীসের ক্যাপ্টেন হয়েছে তা বুঝিনি।

তিনি বলেন, আমি শুধু তাকে বকাঝকা করে বলেছিলাম পড়তে গেছিস পড়বি। অন্য কিছুতে জড়াতে পারবি না।’

অনিক সরকার মোহনপুর সরকারি স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে ঢাকার নটর ডেম কলেজে ভর্তি হয়। সেখান থেকে এইচএসসি পাশের পর বুয়েটে ভর্তি হয়। তিনি বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। জানা গেছে, অনিক সরকার ওরফে অপু ছোট থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিল। সে মোহনপুর কেজি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। অষ্টম শ্রেণিতেও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় সে। ২০১৩ সালে একই বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে এসএসসি পাস করে। পরে ঢাকা নটর ডেম কলেজে ভর্তি হয় এবং জিপিএ ৫ পেয়ে ২০১৫ সালে এইচএসসি পাস করে। একই সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তি হয়।

অনিকের গ্রেফতারের পর থেকে চারিদিকে বলাবলি হচ্ছে যে, তার পরিবার বিএনপি-জামায়েত রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

এ বিষয়ে আনোয়ার হোসেন বলেন, সবাই বলছে আমার পরিবার নাকি বিএনপি-জামায়াতের পরিবার। আমি সবাইকে বলতে চাই, ছেলের অপরাধে বাবা বা তার পরিবারের বিচার করবেন না। আমরা আওয়ামী লীগের পরিবারের মানুষ, আজীবন আওয়ামী লীগেই থাকতে চাই।

প্রসঙ্গত ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় খুন হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জের ধরে রোববার রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পিটুনির সময় নিহত আবরারকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় খুনিরা।

এ হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে ১১ জনকে বহিষ্কার করেছে ছাত্রলীগ।

তারা হলেন- বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ, সাংগঠিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিওন, সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ-দফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ, সদস্য মুনতাসির আল জেমি, এহেতসামুল রাব্বি তানিম ও মুজাহিদুর রহমান।

এদিকে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১৯ জনকেই বুয়েট থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বুয়েট প্রশাসন।

শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টায় বুয়েটের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে সাময়িক বহিষ্কারের এ ঘোষণা দিয়েছেন বুয়েটের ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম।

ভিসি বলেন, ১৯ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। চাইলেই এখনই স্থায়ী বহিষ্কার করতে পারি না। পরে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে।

Check Also

শামীমের ২৫০, সম্রাটের ২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ!

ডেস্ক রিপোর্ট: জি কে বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী কথিত যুবলীগ নেতা গোলাম কিবরিয়া শামীমের প্রায় ২৫০ কোটি …