এখন সময় সকাল ৭:৩৫ আজ বৃহস্পতিবার, ৯ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৪শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ২৪শে সফর, ১৪৪১ হিজরী


Home / জাতীয় / আবরারের মৃত্যু ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ হলে ‘কাঙ্ক্ষিত’ মৃত্যু কোনটি?

আবরারের মৃত্যু ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ হলে ‘কাঙ্ক্ষিত’ মৃত্যু কোনটি?

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে উত্তাল সারাদেশ। প্রতিবাদে নানা কর্মসূচি পালন করছেন মানবিক মানুষেরা। এমন একটা সময় আসে যখন পালানোর পথ থাকে না, ঘুরে দাঁড়াতে হয়। বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তবে এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটা কি হবে, তা এখনো ঠিক করা সম্ভব হয়নি।

‘ঘুমিয়ে যাক’ কথাটি বলার কারণ রয়েছে। লক্ষ্য করুন, আবরার হত্যাকাণ্ডকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু’ আখ্যা দিয়ে শুধুমাত্র ‘জিডি’ করেছে বুয়েট প্রশাসন! প্রশ্ন ও বিস্ময়ের যুগপৎ দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে এই ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ শব্দটি। তবে কি ‘কাঙ্ক্ষিত’ মৃত্যু বলে কিছু আছে?

এমন মৃত্যু কি কখনো ‘কাঙ্ক্ষিত’ হয়! তবে কি কোনোভাবে আবরার ফাহাদের মৃত্যুকে ‘কাঙ্ক্ষিত’ করার চেষ্টা ছিল বা রয়েছে? সেজন্যেই কি ভিন্নমতের অবতারণা? বুয়েট প্রশাসনের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ শব্দটির ব্যবহারে সঙ্গতই এমন প্রশ্নগুলো চলে আসে।

 আবরারদের রক্ষার দায়িত্ব কার, নিশ্চয়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের। উপাচার্য থেকে শুরু করে হলের দায়িত্ব যারা আছেন তাদের। তারা সবাই শিক্ষক। শিক্ষকদের অনেক ক্ষেত্রে পিতার চেয়ে বেশি মর্যাদা দেয়া হয়েছে। শিক্ষকদের অভিভাবক মেনেই পিতারা নিজ সন্তানকে তাদের হাতে সমর্পণ করেন।

তাদের উপর ভরসা করেন। ‘ছাত্র পুত্রবৎ’, এ কথাটা জেনেও যে শিক্ষকগণ পুত্রকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হন, শুধু তাই নয় ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ও ‘কাঙ্ক্ষিত’ মৃত্যুর আশ্চর্য বিভাজন করেন, তাদের কি বলবেন, ঘৃণা করবেন? এরা কি ঘৃণারও উপযুক্ত?

‘উপাচার্য’ শব্দটির উৎস কি এই শিক্ষকেরা জানেন? মনে হয় না। জানলে আবরারের মৃত্যু হতো না এবং মেধাবী কিছু ছেলে খুনি হিসাবে গড়ে উঠতো না। কিছু শিক্ষকের খুনি মানসই এদেরকে খুনি হিসাবে গড়ে তুলেছে। এমন শিক্ষকদের নৈতিকতা যদি থাকতো, তবে তাদের মনের জোর হতো অন্যরকম।

অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। ফলে টর্চার সেল গড়ে উঠতো না হলে হলে। কলকাতার যাবদপুরের মতন যদি অধ্যাপকেরা হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে যেতেন তবে একজন শিক্ষার্থীর গায়েও ফুলের টোকা লাগতো না।

কিন্তু না, আমাদের অধ্যাপকরা ‘অধ্যাপক’ হয়ে উঠলেও ‘শিক্ষক’ হয়ে উঠতে পারেননি। আর তারা যে পারেননি, তার চিত্র বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভিসিকাণ্ডে’ই দৃশ্যমান। উল্টো যেসব ‘অধ্যাপক’ শিক্ষক হয়ে উঠতে চান, তাদের পড়তে হয় নানা প্রতিকূলতায়, যার প্রমাণও দৃশ্যচিত্রের বাইরে নয়।

দর্শনের মূল বিষয় হলো দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্বের মাধ্যমেই একটি বিষয় গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে। আর দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় ভিন্নমতের মাধ্যমে। একটি মতের সঠিকতা যাচাই সম্ভব হয়ে উঠে ভিন্নমতের আলোচনায়। অর্থাৎ ‘ভালো না মন্দ’ এই সহজ কথার দ্বন্দ্ব না উঠলে ভালো বা মন্দকে পৃথক করা সম্ভব নয়।

যারা ভিন্নমতকে দমন করতে চায়, ভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে নির্মূল করতে চায়, মূলত তারা নিজেদের নির্মূলের রাস্তাই প্রশস্ত করে মাত্র। কারণ চিন্তা কখনো নির্মূল করা সম্ভব নয়। চিন্তার শরীর নেই। একজন মানুষকে শারীরিকভাবে শেষ করে দিলেও সেই চিন্তা আরেকজন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যায়।

একজন থেকে আরেকজন এভাবে অসংখ্য মানুষ সেই চিন্তাকে ধারণ করে। সুতরাং মানুষ মেরে চিন্তার সংহার সম্ভব নয়। যারা নির্মূলের চিন্তা করেন, তাদের মূল ধারণায় থাকে ভয় সৃষ্টি করা। ভয় হলো প্যারাসিটামলের মতন সাময়িক চেষ্টা। সব কিছুরই একটা ‘ব্রেকিং পয়েন্ট’ থাকে ভয়েরও রয়েছে।

একটা সময় আসে মানুষ ভয়কে জয় করে ফেলে। ভয় জয় করা মানুষ কতটা দুঃসাহসী হয়, সেটা কল্পনায় ভেবে নেয়াও কঠিন। তবে উপলব্ধি করা যায় ইতিহাসের বিভিন্ন বিপ্লব-বিদ্রোহ পরবর্তী অবস্থা থেকে। বেশির ভাগ নির্মূলের চিন্তা ধারণকারীরা সম্ভবত ইতিহাস বিমুখ বলেই তাদের উপলব্ধিতে অক্ষমতা ভর করে। তারা নির্মূলের জোশে হুঁশ হারান। অন্য কথায় আসি। এক সময় ‘আচার্য’দের এই উপমহাদেশে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানা হতো। তাদের পরামর্শ রাজ্য পরিচালনায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হতো। বর্তমানের ‘উপাচার্য’রা তো সেই ‘আচার্য’রই অংশ। তাদের কথাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হবার কথা।

কিন্তু হয় না। কেন হয় না, সেটাই ভাবনার বিষয়। আবরারের ঘটনার বিক্ষুব্ধ মানুষ উপাচার্যদের নিয়ে ‘ট্রল’ করছেন। উঠে আসছে ‘মেরুদণ্ড’হীনতার কথা। বুয়েটের ‘ভিসি’র ক্যাম্পাসে না আসা নিয়ে একজন লিখলেন, ‘উনি অসুস্থ উনার মেরুদণ্ডের চিকিৎসা চলছে’।

আরেকজন তাৎক্ষণিক প্রশ্ন করলেন, ‘মেরুদণ্ড আছে নাকি?’ এই যে ‘ট্রলে’র ধরণ, তা কি একজন উপাচার্য তথা ‘ভিসি’র প্রাপ্য? অবশ্যই না। কিন্তু তারা ‘ট্রলে’র বিষয় হচ্ছেন। এই ব্যর্থতার দায়ভার কিন্তু তাদেরই। এমনি অনেক দায়ভার দায়িত্বশীলদের নিতে হয়, নেয়া উচিত, নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতায়। যারা ব্যর্থতার দায়ভার নিতে চান না, তাদের দায় ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। এক সময় সেই দায় এতটাই ভারী হয় যে, সেই ভারের নিচে চাপা পড়েই তাদের নিঃশেষ হতে হয়। এটাই ইতিহাসের অমোঘতা। এর ব্যতিক্রম কিছু নেই।

লেখক: কাকন রেজা, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

Check Also

বোমা সন্দেহে লাগেজে মিলল খণ্ডিত লাশ

ডেস্ক রিপোর্ট: অবশেষে ময়মনসিংহ নগরীতে বোমা সন্দেহে ঘিরে রাখা লাল লাগেজ থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ে এক …