এখন সময় রাত ১২:০৭ আজ বৃহস্পতিবার, ৭ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ২১শে মার্চ, ২০১৯ ইং, ১২ই রজব, ১৪৪০ হিজরী


এই মাত্র পাওয়া সংবাদ
Home / জাতীয় / বাঙালীর বংশ পদবীর ইতিহাস

বাঙালীর বংশ পদবীর ইতিহাস

আফতাব হোসেন:
বাঙালী এখনও বংশ পদবী নিয়ে গৌরব বা আত্মঅহংকারের প্রবণতা রয়েছে। তবে আপনি যদি নিজের বংশ পদবীর সঠিক ইতিহাস জানেন তাহলে কিছুটা হলেও পদবী বা উপাধি নিয়ে অহংকার কমে আসবে।  সময়ের পরিক্রমায় ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আসা এই বংশ পদবীর প্রচলন এখন আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। তবে বংশ-পদবির উৎপত্তি কিন্তু খুব বেশি প্রাচীন নয়; মধ্যযুগে সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার ফলে পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তোর সমান্তরালে বাঙালী পদবীর বিকাশ ঘটেছে বলে ধারনা করা হয়।
উপাধি, উপনাম কিংবা বংশসূচক নামকে পদবী বলা হয়। বাঙালীর জমি-জমা সংক্রান্ত পদবী যেমন- হাওলাদার, মজুমদার, পোদ্দার, সর্দার, প্রামানিক, হাজরা, হাজারী, মন্ডল, মোড়ল, মল্লিক, সরকার,বিশ্বাস ইত্যাদি পদবী রয়েছে হিন্দু-মুসলমান সকল সম্প্রদায়ের একান্তরূপ। বাঙালী মুসলমানের শিক্ষক পেশার পদবী হল-খন্দকার, আকন্দ, নিয়াজি ইত্যাদি। আর হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষক পদবী হল, দি¦বেদী, ত্রিবেদী, চর্তুবেদী ইত্যাদি।
বাঙালীর কিছু বিখ্যাত বংশ পদবি হল- শিকদার, সৈয়দ, মীর, মোল্লা, দাস, খন্দকার, আকন্দ, চৌধুরী, ভূইয়া, মজুমদার, তরফদার, সরকার, মল্লিক, মন্ডল, পন্নি, ফকির আনছারি,দত্ত, শিকদার।
সুলতানী আমলে কয়েকটি মহল নিয়ে গঠিত ছিল একেকটি শিক। শিক হল একটি খন্ড এলাকা বা বিভাগ এর সাথে ফারসি দার যুক্ত হয়ে শিকদার বা শিকর শব্দের উদ্ভোব হয়। এরা ছিলেন মূলত রাজস্ব আদায় নিয়োজিত কর্মচারী। শব্দকোষে বলা হয়েছে শান্তি রক্ষক কর্মচারী। এরা শিক বন্দুক কিংবা ছুরি বন্দুক ব্যবহার করেছে বলে শিকদার উপাধি পেয়েছিল। সেই থেকে বংশপরম্পরায় শিকদার পদবীর বিকাশ ঘটে। সৈয়দ পদবী এসেছে নবী কন্যা হযরত ফাতেমা ও হযরত আলীর  বংশ থেকে। প্রায় দেড় হাজার বছর আগের এই বংশের সাথে বর্তমান সৈয়দদের যোগসূত্র না থাকলেও বাংলাদেশের অনেক মুসলমান পরিবার সৈয়দ বংশ ব্যবহার করে নিজেদের সম্ভ্রান্ত ও কুলিন মুসলাম বলে দাবী করেন। বাঙালী মুসলাম পরিবারে সৈয়দ পদবীর অপব্যবহার ঘটেছে অনেক বেশি। এখনও অনেক পরিবারের লোকজন নিজেদের সৈয়দ বংশের পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে আত্মঅহংকার নিয়ে চলাফেরা করেন।
শেখ-আরবী থেকে শব্দ। সম্ভ্রান্ত মুসলামদের সম্মানসূচক পদবী হল শেখ। গোত্রের সম্মানিত বৃদ্ধ বা গোত্র প্রধানকেই বলা হত শেখ। হযরত মুহাম্মদ (সা:) সরাসরি যাকে ইসলাম ধর্মে দিক্ষিত করেছিলেন তিনি বা তার বংশধারা শেখ নামে অবিসিক্ত হতেন অথবা শেখ পদবী লাভ করতেন। বাঙালী সমাজে যারা শেখ পদবী ধারন করেন, তারা এমন ধারনা পোষন করেন যে, তারা বা তাদের পূর্ব পুরুষেরা এসেছেন সৌদি আরব থেকে।
মীর শব্দ এসেছে আরবি থেকে থেকে। অর্থ অনুযায়ী মীর অর্থ দলপতি, নেতা, সর্দার ইত্যাদি। জিতে নেওয়া কিংবা জয়ী হওয়া অর্থে মীর শব্দ ব্যবহার করা হতো। তবে মীর বংশ সম্ভ্রান্ত কিংবা সৈয়দ বংশের একটি শাখাকে মীর বংশ বলে মনে করেন গবেষকেরা। মিয়া- মুসলিম সম্প্রদায়ের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে ব্যবহৃত সম্মানসূচক শব্দ। এর অর্থে সকল মুসলমানেরই পদবি হচ্ছে মিয়া। ব্ঙাালী হিন্দু মহোশয় এর বিপরীতে মুসলমানেরা মিয়া ব্যবহার করে থাকে। মিয়া শব্দটি এসেছে ফারাসি ভাষা থেকে। মোল্লা এবং মুন্সি ব্ঙ্গাালীর দুটি জনপ্রিয় পদবী। তাদের প্রসার প্রায় দেশব্যাপি। বঙ্গের শব্দকোষে মোল্লা শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে মুসলমান পুরোহিত। বশতঃত মসজিদে নামাজ পরিচালনার কারণে অনেকে মোল্লা উপাদি পেয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে মোল্লা হচ্ছে তুর্কি ও আরবী ভাষার আগত একটি শব্দ। যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পরিপূর্ণ  জ্ঞান বিশিষ্ট একটি মহাপন্ডিত ব্যক্তি। দাস- বাঙ্গালী হিন্দু সম্প্রাদায়ে দাস পদবী ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেসমস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের বংশ পদবীতে দাস লিখেন তাদের পদবী শ্রষ্টারপ্রতি ভীত চেতনা থেকে এসেছে বলে গবেষকেরা মনে করেন। মুসলিম সমাজে ফরাসি শিক্ষক খন্দকার বা খন্দকারের পরিচয় পাওয়া যায়। অন্যদিকে খন্দকারের পদবী এসেছে সামন্ত সমাজের পেশাজীবী থেকে। সাধারনত খন্দকার বা খন্দকারে হল কৃষক বা চাষাবাদকারী। সংস্কৃত চতুধারী শব্দ থেকে এসেছে বাংলা চৌধুরী শব্দ। এর অর্থ চতুর সীমানা অন্তধারী অঞ্চলের শাসক। বাংলাদেশের বেশিরভাগ জমিদারীদের পদবী হচ্ছে চৌধুরী। অনেকে মনে করে এক চতুর্থ যার ভৌগোলিক অংশ তাদেরকেই চৌধুরী বলা হয়ে থাকে। ভূইয়া- এই বংশ পদবীটি এসেছে খোদ ভূমির মালিকানা অংশ থেকে। ব্্াঙালী মুসলিম  ও হিন্দু উভয়ের মধ্যে এই পদবীর প্রচলন আছে। বাঙালী হিন্দু সমাজে যারা ভৌমিক মুসলিম সম্প্রদায়ে তারাই ভূইয়া তারা পদবী ধারন করেছেন। আবার যারা বন জ্ঙ্গল পরিস্কার করতেন তারাই জমিদার থেকে কিছু জমি-জমা নিয়ে ভূইয়া হিসেবে পরিচিত অর্জন করেছেন। মজুমদার- মজুমদার পদবীর মূলে আসলে মজুনদার। এর মূল ফারসি শব্দ হল মজগু আনদার। রাষ্ট্রের বা জমিদারদের দলিলপত্রাদি রক্ষার জন্য এই পদবিটি ছিল। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে এই পদবীটি ব্যবহার করে থাকেন। তরফদার- আরবী তরফ, ফারসি দার মিলে তরফদার শব্দটি এসেছে। রাজ্যের খাজনা আদায়ের উপাদি ছিল তরফদার। এই পদবীর পূর্ব পুরুষেরা রাজকার্য পরিচালনায় নিয়োজিত ছিলেন। তালুকদার- আমাদের দেশে পরিচিত একটি বংশ পদবি। বাংলাদেশে জমিদারীর পর তালুক ভূ-সম্পত্তির একটি বিভাগ। মোঘল আমলে তালুকদার বংশের উৎপত্তি হয়। সরকার শব্দটি ফারসি থেকে আগত। এর অর্থ-প্রভু, মালিক, ভূ-স্বামী, শাসককর্তা, রাজা। মূঘল আমলে এই অঞ্চলে স্থানীয় রাজ কর্মচারীদের এই পদবী দেওয়া হতো। মালিক শব্দ থেকে এসেছে মল্লিক শব্দ।  এটি মূলত জোতদারীর উপাধি। গ্রাম বা সমাজের প্রধান ব্যক্তিকেই মল্লিক উপাধি দেওয়া হতো। বাঙালী হিন্দু মুসলিম সমাজে সমানভাবে ব্যবহৃত হয় মন্ডল। বাংলাদেশে অনেককাল থেকে গ্রাম প্রধানকে মন্ডল উপাদি দেওয়ার প্রচলন আছে। মন্ডলেরা আগে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। খাজনা আদায়ে তারা বেশি সুবিধা নিতেন এবং গ্রামের আপদ-বিপদ মিমাংসা বা মধ্যস্থতা করতে তারা পটু ছিলেন।
ফকির- মুসলমানদের মধ্যে সন্ন্যাসীবিত্ত থেকে এসেছে ফকির। মরমী সাধকেরা গ্রহণ করতেন ফকির পদবী। এটি আরবি শব্দ যার মূল অর্থ নিঃশ্ব। আবার আরবি ফকর শব্দের অর্থ দারিদ্র- এ থেকে ফকির। ফকির বংশের লোকেরা বাড়িঘর ছেড়ে সন্যাসিবৃত্ত ধারন করতেন। বিশেষতঃ যারা কোন ধর্মের একান্ত মতে অনুসারী না হয়ে সকল ধর্মের অনুসারী হয়ে আত্মতত্তে¡র অনুসারী তাদেরকেও ফকির বলা হয়। আবার সুফি বা বাউল তত্তে¡র ধারকেরাও ফকির।
ঠাকুর শব্দের মূল শব্দ হচ্ছে ঠাক্কুর, এর প্রকৃত অর্থ ঠকর এবং বাংলা ঠাকুর থেকে এসেছে। পদবীগত দিকে থেকে ব্র্ক্সামনের পদবী বিশেষ। ঠাকুর বংশের লোকেরা নিজেদের সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী মনে করে অন্যভাবে চলাফেরা করেন। তারা নিজেদের খুব সংস্কৃতি জ্ঞানী মনে করেন। এরকম শতাধিক বংশ পদবী রয়েছে আমাদের দেশে।

Check Also

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন স্থগিত!

গোবিন্দগঞ্জ প্রতিনিধি: হাইকার্টের আদেশ অনুসারে নির্বাচনের তিনদিন আগে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন স্থগিত করেছে …